পাখির উৎপত্তি ডাইনোসর থেকে
আপনি যদি কখনো কবুতর দেখে ভেবে থাকেন যে, এটি কিছুটা ক্ষুদ্র দানবের মতো দেখতে। তাহলে আপনার ধারণা সঠিক! পাখির উৎপত্তি কীভাবে হয়েছিল তার গল্পটি হলো মাটি থেকে মেঘের দিকে একটি রোমাঞ্চকর যাত্রা। লক্ষ লক্ষ বছর আগে আমাদের পালকযুক্ত বন্ধুদের পূর্বপুরুষরা উড়তে পারতো না; তারা দুই পায়ে দৌড়াতো এবং আঁশ দিয়ে ঢাকা শরীর। এরা ছিল থেরোপড ডাইনোসর। একই দলে বিখ্যাত টাইরানোসরাস রেক্সও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
লক্ষ লক্ষ বছর ধরে এই ভয়ংকর প্রাণীগুলি পরিবর্তিত হতে শুরু করে। কোন কোন প্রাণীর উষ্ণ থাকার বাসনায় শরীরে ছোট নরম পালক গজায়। আবার অন্যদের ক্ষেত্রে তৈরি হয় লম্বা বাহু, যা অবশেষে ডানা হয়ে ওঠে।
পাখি ও ডাইনোাসরদের মাঝে যোগসূত্র স্থাপনকারি বিখ্যাত প্রাণীটি হলো আর্কিওপ্টেরিক্স। এটি এমন একটি প্রাণী যার দাঁত এবং লেজ ছিল ডাইনোসরের মতো কিন্তু পালক এবং ডানা ছিল পাখির মতো। আজ আপনি যে পাখিগুলো দেখতে পান, ক্ষুদ্র হামিংবার্ড থেকে শুরু করে বিশাল উটপাখি পর্যন্ত, তারা হলো মহাবিপর্যয় থেকে রক্ষা পাওয়া ডাইনোসরদের বংশধর!
বিবর্তনীয় যাত্রা: পৃথিবী থেকে আকাশে
বহু বছরের সাধনার পর পাখির রূপে পরিবর্তন এসেছে। পরিবর্তনের ধারা নিম্নে দেখানো হলো:
ফসিল আবিষ্কার ও পাখির অজানা কাহিনী
পাখিদের ডানা কেমন করে হলো? আর কবেই তা হয়েছে? এ প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য বিজ্ঞাণীগণ প্রাগঐতিহাসিক প্রাণীর ফসিল খুজে বেড়াচ্ছেন। উদাহরনস্বরূপ, ১৮৬০-এর দশকের গোড়ার দিকে আর্কিওপ্টেরিক্সের জীবাশ্মের নমুনা আবিষ্কৃত হয়। প্রথমে একটি পালক এবং তারপরে মাথা ছাড়া একটি কঙ্কাল। এমন একটি প্রাণী যার কিছু অংশ পাখির মতো, আর কিছু অংশ ডাইনোসরের মতো।
আর্কিওপটেরিক্স পাখির আকার ছিল কাকের মতো এবং কালো পালকযুক্ত (ছবি নং-১ দেখুন)। তারা খুব ভালো উড়তে পারতো না। বেশিরভাগ সময় মাটিতে থাকতো এবং মাঝে মাঝে বাতাসে উড়ে বেড়াত। এট করতো সম্ভবত লুকিয়ে থাকা শিকারীদের হাত থেকে বাঁচতে।
তাদের চোয়ালে দাঁত এবং ডানার প্রান্তে থাবা ছিল। ধারনা করা হয় জুরাসিক যুগের পাখিরা প্রথম বিবর্তিত হয়েছিল। আর্কিওপ্টেরিক্স পাখি আধুনিক যুগের মুরগির মতো যারা খুব একটা উড়তে পারে না।
জুরাসিক যুগের দ্বিতীয় প্রজাতির পাখিটি হলো Baminornis zhenghensis যার ফসিল চীনে আবিষ্কৃত হয়। পাখিটি সম্পর্কে বর্ণনা করা হয় ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে। এই প্রাণীটি ১৪৮ মিলিয়ন থেকে ১৫০ মিলিয়ন বছর আগে বিদ্যমান ছিল। অর্থাৎ এরা ছিল আর্কিওপ্টেরিক্স পাখিদের সমসাময়িক। এই পাখিটির রয়েছে অর্নিথোথোরাসিনের মতো বক্ষ এবং শ্রোণী বন্ধনী এবং প্লেসিওমরফিক নন-অ্যাভিয়ালান ম্যানিরাপ্টোরান হাতের এক অনন্য সমন্বয়- বিবর্তনের এক সুন্দর উদাহরণ।
ছবি নং- ১। আর্কিওপটেরিক্স (Archaeopteryx) ও Baminornis zhenghensis: জুরাসিক যুগের পাখি
এই ফসিলের উদাহরণ আমরা জানতে পারি যে, জুরাসিকের শেষের দিকে পাখিরা আরো পরিশীলিত বায়ুগতিগত (aerodynamic) এবং উড়ন্ত শৈলী নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং বিকাশ শুরু করেছিল। আর্কিওপ্টেরিক্স এবং ব্যামিনোর্নিস বেশ আলাদা ছিল। এই সত্যটি ইঙ্গিত দেয় যে, পাখিরা ইতিমধ্যেই বৈচিত্র্যময় ছিল, যা পূর্বের ধারণার চেয়েও বিবর্তনীয় ইতিহাসের ইঙ্গিত বহন করে। তবে বিতর্কের এখনো শেষ হয়নি। অদূর ভবিষ্যতে হয়তো সঠিক উত্তর জানা যাবে।
গত অর্ধ শতাব্দী ধরে গবেষকগণ প্রতিষ্ঠিত করেছেন যে, পাখিরা ডাইনোসর থেকে বিবর্তিত হয়েছে, বিশেষ করে থেরোপড থেকে। এই দলে রয়েছে টার্কির আকারের ভেলোসিরাপ্টর এবং বিশাল অ্যালোসরাস সহ পাখিদের দল (ছবি নং-২)।
ছবি নং- ২: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে তৈরি
ক্রিটেসিয়াস যুগ ছিল ১৪৩.১ মিলিয়ন থেকে ৬৬ মিলিয়ন বছর আগে। সেই সময়কালে অনেক ক্রিটেসিয়াস পাখি ছিল (ছবি নং- ৩)। তারা এন্যান্টিওরনিথাইনের মতো গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং ক্রিটেসিয়াস যুগের শেষে বিলুপ্ত হয়ে যায় গ্রহাণু-সম্পর্কিত কারণে গণবিলুপ্তির মাধ্যমে।
ফুজিয়ানভেনেটর (Fujianvenator): পাখির মতো দেখতে একটি ডাইনোসর সম্ভবত অন্যান্য ডাইনোসরের তুলনায় পাখির সাথে বেশি ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত ছিল (ছবি নং-৩)। ফুজিয়ানভেনেটরের পিছনের পা লম্বা ছিল, যা ইঙ্গিত দেয় যে এটি সম্ভবত জলে অনেক সময় ধরে হেঁটে বেড়াতো।
ছবি নং-৩: ক্রিটাসিয়াস (Cretaceous bird) ও ফুজিয়ানভেনেটর প্রোডিগিয়োসাস (Fujianvenator prodigiosus) পাখি
আকাশে কে প্রথম উড়েছিল?
বিগত ২০০৩ সনে Xing Xu ও তার সহকর্মীগণের বর্ণনা মোতাবেক জেহোল বায়োটার অন্তর্গত মাইক্রোর্যাপটর প্রথম আকাশে উড়েছিল তবে এটা কিন্তু পাখি ছিল না- একটি ছোট ডাইনোসর (ছবি নং-৪)। এরা তার সামনের এবং পিছনের অঙ্গ ব্যবহার করে উড়তো। দুটির পরিবর্তে চারটি ডানা ছিল।
বিগত ২০১৫ সনে Xu and O’Connor এর বর্ণনা অনুযায়ী যাকে পাখির আরো নিকট আত্মীয় হিসেবে বিবেচনা করা যায় তার নাম হলো Yi। Yi জুরাসিকের শেষের দিকের ইয়ানলিয়াও বায়োটা থেকে এসেছে এবং এটি একটি স্ক্যানসোরিওপ্টেরিজিড (Scansoriopterygid): একটি থেরোপড ডাইনোসর। এই প্রাণীর প্রতিটি কব্জিতে ছিল ঝিল্লি সংরক্ষিত একটি দীর্ঘ প্রসারিত হাড়। এর অর্থ হলো Yi উড়েছিল তবে তা পাখির মতো পেনাসিয়াস পালক দিয়ে নয় বরং একটি ঝিল্লি দিয়ে- বাদুড়ের ডানার মতো।
ছবি নং-৪: মাইক্রোর্যাপ্টর যা আর্কিওপ্টেরিক্সের পর আড়াই কোটি বছর পর্যন্ত বেঁচে ছিল এবং Yi
বিগত ২০২৫ সালের মে মাসে ও'কনর, ওয়াং এবং তাদের সহকর্মীরা আর্কিওপ্টেরিক্সের ১৪তম নমুনা বর্ণনা করেন। অবশ্য এটি আবিষ্কৃত হয়েছিল ১৯৯০ সনে। অন্যান্য নমুনার তুলনায় এর ডানাগুলি ছিল দেহ থেকে দূরে- বিশেষায়িত এই ডানাকে টারশিয়াল বলা হয়। এগুলি উড়ার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ এগুলো ডানা এবং দেহের মধ্যে ফাঁক বন্ধ করতে পারতো। ফলে অবিচ্ছিন্ন পৃষ্ঠতল তৈরি হতো যা উড্ডয়নে সাহায্য করতে পারে।
নমুনার মাথাটি মুখের তালু বা তালুর গঠনের উপস্থিতিও প্রকাশ করেছে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার; কারণ জীবিত পাখিদের তালু অত্যন্ত চলমান থাকে, যা তাদের বিশেষায়িত খাদ্য প্রক্রিয়া বিকশিত করতে সক্ষম করে।
২০২৫ সালের আগস্টে প্রকাশিত আরেকটি গবেষণাপত্রে ও'কনর এবং তার সহকর্মীরা দেখিয়েছিলেন যে, আর্কিওপ্টেরিক্সের এমন বৈশিষ্ট্য ছিল যা এটিকে দ্রুত খেতে সক্ষম করতো। বৈশিষ্টগুলো হলো একটি চলমান জিহ্বা এবং তার ঠোঁটের ডগায় একটি সংবেদনশীল অঙ্গ। এই বৈশিষ্ট্যগুলি উড়তে সহায়তা করার একটি উপায় হিসাবে বিকশিত হয়েছিল।
দৃষ্টিনন্দন পাখিরা
পাখিরা হলো সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় প্রাণী গোষ্ঠীর মধ্যে একটি। এদের প্রায় ১০,০০০ প্রজাতি রয়েছে। ক্ষুদ্র হামিংবার্ড থেকে শুরু করে অ্যালবাট্রসের মতো দুর্দান্ত ভ্রমণকারী পাখি, সোনালী ঈগলের মতো শীর্ষ শিকারী এবং এমুর মতো বৃহৎ প্রাণী আছে। ওরা বেঁচে থাকুক প্রকৃতিতে মিশে।
উপসংহার
এটা উপলব্ধির বিষয় যে, আপনি যখন একটি পাখিকে "নীল" আকাশে উড়তে দেখছেন তখন আপনি বিবর্তনের একটি অলৌকিক ঘটনা প্রত্যক্ষ করছেন। তারা ভারী দাঁতের বিনিময়ে হালকা ঠোঁটের অধিকারি হয়েছে এবং শক্তিশালী নখরকে ডানায় রূপান্তরিত করেছে।
পৃথিবী-আবদ্ধ শিকারী থেকে আকাশের মালিক হওয়ার এই "উজ্জ্বলতা" ইতিহাসে বেঁচে থাকার সর্বশ্রেষ্ঠ গল্পগুলির মধ্যে একটি। পরের বার যখন আপনি একটি পাখি দেখবেন, কেবল একটি পোষা প্রাণী বা গায়ক পাকিকে দেখবেন না। ভাবুন একটি ক্ষুদ্র, পালকযুক্ত বেঁচে থাকা প্রাণী যা গ্রহাণুখন্ডের আঘাতগুলিকে পাশ কাটিয়ে বেঁচে আছে।
তাদের ডানাগুলি সময়ের গভীর সমুদ্র পেরিয়ে আমাদেরকে উপহার দিচ্ছে নানান বৈচিত্রময় পালকের রং। এট প্রমাণ করে যে, কোন জাদুবলে বলে নয়, বরং প্রকৃতি আমাদের আকাশে পৌঁছাতে সাহায্য করতে পারে যখন আমরা তা মনে প্রাণে চাই!
FAQs
পাখিরা কি আসলেই ডাইনোসরের সাথে সম্পর্কিত?
হ্যাঁ! বিজ্ঞানীরা দেখেছেন যে পাখিরা থেরোপডের সরাসরি বংশধর। প্রকৃতপক্ষে জীববিজ্ঞানের জগতে পাখিদেরcj "এভিয়ান ডাইনোসর" হিসাবে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়েছে। ডাইনোসর বংশের একমাত্র শাখা যা ৬৬ মিলিয়ন বছর আগে বিলুপ্ত হয়নি।
ডাইনোসররা যদি উড়তে না পারে, তাহলে কেন তাদের পালক জন্মাত?
প্রথম পালকগুলি উড়ার জন্য ছিল না। এগুলি সম্ভবত ডাইনোসরদের উষ্ণ রাখার জন্য অন্তরক হিসাবে ব্যবহৃত হতো। পরে তারা সঙ্গীদের আকর্ষণ করার জন্য বা দৌড়ানোর সময় ভারসাম্য বজায় রাখতে রঙিন পালক ব্যবহার করতে পারে।
প্রথম পাখিকে কী বলা হত?
সবচেয়ে বিখ্যাত আদি পাখি হল আর্কিওপ্টেরিক্স। এটি প্রায় ১৫ কোটি বছর আগে বেঁচে ছিল। এটি একটি নিখুঁত সেতু জীবাশ্ম, কারণ এতে সরীসৃপ বৈশিষ্ট্য (যেমন নখ এবং দাঁত) এবং পাখি বৈশিষ্ট্য (যেমন ডানা) এর মিশ্রণ রয়েছে।
ডাইনোসররা কীভাবে উড়তে শুরু করেছিল?
দুটি প্রধান ধারণা রয়েছে। ভূমিতে থাকা তত্ত্বটি পরামর্শ দেয় যে, তারা দ্রুত দৌড়াত এবং উচ্চতর লাফ দেওয়ার জন্য তাদের বাহু ঝাপটায়। গাছের নিচে থাকা তত্ত্বটি পরামর্শ দেয় যে, তারা গাছে উঠে নীচে নেমে যেতে শুরু করে, অবশেষে ঝাপটায় এবং উড়তে শিখে।
পাখিদের কি এখননো "ডাইনোসর" বৈশিষ্ট্য রয়েছে?
অবশ্যই! আপনি যদি পাখির পা দেখেন, আপনি দেখতে পাবেন যে, তা আঁশ দিয়ে ঢাকা। পাখিরাও শক্ত খোলসযুক্ত দিয়ে ডিম পাড়ে, ঠিক যেমন তাদের প্রাচীন পূর্বপুরুষরা লক্ষ লক্ষ বছর আগে করেছিলেন।