পরাগায়নের জগতে পশমযুক্ত ও আঁশযুক্ত ছোট প্রাণীর ভুমিকা

Category: Science & Environment | Tags: No tags

Author: Jatish Chandra Biswas | Published on: January 5, 2026, 9:40 p.m.


পরাগায়নের বিচিত্র জগৎ

আমরা কী জানি কত রকমের প্রাণী ফুলের পরাগায়নে সাহায্য করে? ছোট পশু, পাখি, প্রজাপতি, পিঁপড়া, মথ, মৌমাছি এবং বোলতা পরাগায়নে ভুমিকা রাখে। তবে বর্তমান প্রবন্ধে আমি ছোট পশমযুক্ত ও আঁশযুক্ত প্রাণী পরাগায়নে কি ধরনের ভুমিকা রাখে তা নিয়ে আলোচনা করবো।

দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রাক-ভোরের ছায়ায় ফিনবোসের শান্ত ঝোপঝাড়ে একটি ছোট পশমযুক্ত প্রাণী পাতার আবর্জনার মধ্য দিয়ে ছুটে বেড়াচ্ছে। এটি কোনও শিকারী প্রাণী নয়, বা মৃতদেহ ভক্ষণকারি প্রাণীও নয়। 

শিরভূমির কাটাযুক্ত ইঁদুর যখন তার থুতনি দিয়ে মাটির স্তরে লুকিয়ে থাকা একটি বিবর্ণ বাদামী ফুলের মধ্যে চাপ দেয়, তখন এটি থেরোফিলি নামে পরিচিত জৈব নাটকের একটি অপরিহার্য নায়ক হয়ে ওঠে। অর্থাৎ উড়তে পারে না এমন স্তন্যপায়ী প্রাণীদের দ্বারা উদ্ভিদের পরাগায়ন সম্পন্ন হওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষভাবে ভূমিকা রাখছে।

জীববৈচিত্র্যের উপর বিশ্বব্যাপী আলোচনা প্রায়শই মৌমাছির দুর্দশাকে ঘিরে আবর্তিত হয়। বাস্তবে পরাগায়নকারীদের একটি লুকানো গুরুত্বপূর্ণ দল রয়েছে। এ দল সম্পর্কে জানতে হলে মাদাগাস্কারের বনের লেমুর থেকে শুরু করে ভারত মহাসাগরের দ্বীপপুঞ্জের গেকো প্রাণীকে জানতে হবে। 

লক্ষ লক্ষ বছর ধরে তারা নীরবে আমাদের বাস্তুতন্ত্রকে ইঞ্জিনিয়ারিং করে আসছে। এই বৈচিত্র্যময় দলটি ফুল প্রস্তুতকারি উদ্ভিদ জগতের আনুমানিক শতকরা ৮০ ভাগ ক্ষেত্রে প্রজননে সাহায্য করে। ফরে তারা বিশ্বব্যাপী খাদ্য নিরাপত্তার একটি উল্লেখযোগ্য অংশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অংশিদার।

আকর্ষণের গোপনীয়তা: কেন কিছু ফুল বিয়ারের মতো গন্ধ ছড়ায়

থেরোফিলি বুঝতে হলে প্রথমেই ফুলের ঐতিহ্যবাহী চিত্রটি বাদ দিতে হবে। স্তন্যপায়ী প্রাণীদের দ্বারা পরাগায়নের জন্য বিবর্তিত উদ্ভিদগুলি প্রাণবন্ত পাপড়ি বা মিষ্টি সুগন্ধির উপর শক্তির অপচয় করে না। তার পরিবর্তে তারা স্তন্যপায়ী প্রাণীর ঘ্রানেন্দ্রিয়কে উত্তেজিত করার পন্থা আবলম্বন করে, যাকে উদ্ভিদবিদরা "ফ্লোরাল সিনড্রোম" বলে থাকেন।

বেশিরভাগ স্তন্যপায়ী প্রাণী উড়তে জানেনা। তারা নিশাচর এবং তাদের ঘ্রাণশক্তি অত্যন্ত উন্নত কিন্তু রঙিন ফুলের জন্য তাদের কোন মোহ নেই। এ কারণেই থেরোফিলাস ফুলগুলি প্রায়শই রহস্যময় আবরণে ঢাকা থাকে। এ ধরনের ফুলগুলি মাটির কাছে বা ঘন পাতার ভিতরে লুকিয়ে থাকে এবং এদের রং হয় ঘন বাদামী, ক্রিম বা গাঢ় বার্গান্ডি রঙের মতো।

উল্লেখিত ফুলগুলোর সবচেয়ে আকর্ষণীয় অভিযোজন হলো সুগন্ধ বা দুর্ঘন্ধ ছড়ানো। এই ফুলগুলি প্রায়শই অ্যালিফ্যাটিক কিটোন এবং সালফার যৌগ দ্বারা উৎপাদিত দুর্ঘন্ধ, গাঁজলাযুক্ত বা টক গন্ধ নির্গত করে। দুর্ঘন্ধ ছড়িয়ে পরাগায়নকারিকে যারা আকর্ষণ করে তাদেরকে সম্পর্কে জানতে ফুলের রং ও প্রজাপতি/মথ নিয়ে লেখাটি পড়তে পারেন।

এই ধরনের সুগন্ধ/দুর্ঘন্ধ গাঁজাইয়া ওঠা ফল বা ছত্রাকের গন্ধের অনুরূপ। ফলে ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণীরা মনে করে তাদের খাদ্যের উৎস কাছাকাছি। অধিকন্তু স্তন্যপায়ী প্রাণীরা ভারী এবং প্রায়শই খাবার খাওয়ার সময়  সাথে রুক্ষ হয়। তাই এই ফুলগুলি গঠনগতভাবে শক্তিশালী, কাঠের মতো শক্ত ব্র্যাক্ট, আয়তনের বড় এবং অধিক পরিমাণে মধু থাকে যা স্তন্যপায়ী প্রাণীর উচ্চ বিপাকীয় চাহিদা পূরণ করে।

স্তন্যপায়ি প্রাণী দ্বারা পরাগায়ন

সব ধরনের স্তন্যপায়ি প্রাণী পরাগায়নের সাথে সম্পর্কিত নয়। পৃথিবীর নানান প্রান্তে বিশেষ কয়েকটি ছোট স্তন্যপায়ি প্রাণী পরগায়নে সাহায্য করে থাকে। বিষয়টি নিয়ে নিম্নে আলোচনা করা হলো-

রাতের অতিথি ইঁদুর: মাটি কাটায় বিশেষজ্ঞ

দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ ফ্লোরিস্টিক অঞ্চলে ইঁদুর এবং প্রোটিয়া প্রজাতির মধ্যে সম্পর্ক বিবর্তনের ধারায় প্রবাহমান। প্রোটিয়া হিউমিফ্লোরার (Protea humiflora) মতো প্রজাতিগুলি "জিওফ্লোরাস" ফুল উৎপন্ন করে। অর্থাৎ তারা পাতার ছাউনির নীচে ভূমি স্তরে ফোটে। আর ইঁদুর তা থেকে মধু খায়।

এই উদ্ভিদগুলির ফুলে বিচরনের জন্য আসে প্রধানত নেংটি ইঁদুর, ইঁদুর এবং শ্রুরা (প্রোটিয়াদের পরাগায়নকারি)। ইঁদুর যখন চটচটে ঘন নেকটার (মধু) চাটে, তখন পরাগরেণু তার পশম এবং গোঁফের সাথে লেগে যায়। প্রাণীটি যখন পরবর্তী উদ্ভিদে যায় মধু খেতে, তখন ঐ সকল রেণু বহুল পরিমানে বহন করে নিয়ে যায়। এটা এক ধরনের অগোছালো পরাগায়ন, তবে অত্যন্ত কার্যকরি। 

মার্সুপিয়াল: অস্ট্রেলিয়ার মধু বিশেষজ্ঞ

ভারত মহাসাগর জুড়ে, অস্ট্রেলিয়ার অনন্য বিবর্তনীয় ইতিহাস বিশ্বের সবচেয়ে বিশেষায়িত স্তন্যপায়ী পরাগায়নকারি তৈরি করেছে।

হানি পসাম (টারসিপেস রোস্ট্র্যাটাস)

এই ক্ষুদ্র মার্সুপিয়ালটি কয়েকটি স্তন্যপায়ী প্রাণীর মধ্যে অন্যতম যারা উড়তে পারে না। এরা  বাধ্যতামূলকভাবে মধুপায়ি। এর নাক লম্বাটে এবং এর জিহ্বার ডগা সূক্ষ্ম ব্রিস্টলের ব্রাশ দিয়ে তৈরি। ফলে এরা  প্রায় মধুখেকো পাখিদের মতোই অভিযোজিত।

সুগার গ্লাইডার (Petaurus breviceps)

গ্লাইডাররা আকাশে গ্লাইডিং এর জন্য বিখ্যাত হলেও তারা ব্যাংকসিয়া প্রজাতির মতো একটি নতুন উদ্ভিদ প্রজাতির উল্লেখযোগ্য পরাগায়নকারী। উঁচু মগডালের ফুল থেকে এরা  মধু  সংগ্রহের সময় তাদের ঘন, নরম পশম পরাগ রেণু বহনের জন্য জৈবিক "ভেলক্রো" (ছোট ছোট হুক ও লুপ সিস্টেমের মাধ্যমে দুটি কাপড়কে জোড়া লাগানোর এক ধরনের গিঁট) হিসেবে কাজ করে।

প্রাইমেটস: বনের দৈত্যরা

মাদাগাস্কারের বনে পরাগায়ন বৃহত্তর পরিসরে ঘটে থাকে। কালো-সাদা রাফড লিমুর (Varecia variegata) বিশ্বের বৃহত্তম পরাগায়নকারীর খেতাব ধারণকারি প্রাণী। এই প্রাইমেটদের ট্র্যাভেলার্স পাম গাছের (Ravenala madagascariensis) সাথে একটি অনন্য সম্পর্ক রয়েছে.

পামের ফুলগুলো কাঠের মতো শক্ত ব্র্যাক্ট দিয়ে আবৃত থাকে। ফলে ছোট প্রাণীরা এখান থেকে মধু খেতে পারে না। তবে লিমুর তার দক্ষ হাত দিয়ে ব্র্যাক্টগুলিকে আলাদা করে টেনে নেয় এবং তার লম্বা থুতনি ও জিহ্বার সাহায্যে মধু পান করে। 

নেকটার/মধু সংগ্রহের সময় লিমুরের মুখে হলুদ পরাগরেণু লেগে যায়। যেহেতু লিমুররা বনের মধ্যে দীর্ঘ দূরত্ব ভ্রমণ করে এবং অন্য গাছের ফুলের মধু খায়, তাই তারা পরপরাগায়নে বিশেষ অবদান রাখে। এর ধরনের কার্যাদির ফলে মাদাগাস্কারের রেইনফরেস্ট সুন্দরভাবে রক্ষিত হচ্ছে।  

ব্যতিক্রমি সরীসৃপ: দ্বীপ বিবর্তন

যদিও থেরোফিলি ঐতিহ্যগতভাবে স্তন্যপায়ী প্রাণীদের বোঝায়। তবে উড়তে পারে না এমন পরাগায়নকারীদের গবেষণায় ব্যতিক্রমধর্মী সরীসৃপকে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। প্রত্যন্ত দ্বীপগুলিতে যেখানে স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং মৌমাছি প্রায়শই অনুপস্থিত থাকে, সেখানে গেকো এবং স্কিনকের মতো টিকটিকি পরাগায়নকারী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।

পরাগায়নকারি গেকো

যখন অন্য কোন পরাগায়নকারি নেই, তখন এই গেকো বাঁচিয়ে রাখছে দ্বীপের গাছপালাকে। উদাহরনস্বরূপ- সিশিলি দ্বীপে ব্রোঞ্জ গেকো গ্রীষ্মমন্ডলীয় ফুল বনে ঘন ঘন যাতায়াত করে। টিকটিকির ত্বক আঁশযুক্ত, তবুও পরাগরেণু তাদের আঠালো গলা এবং পেটে লেগে থাকে। এই ঘটনাটিকে বলা হয় সরোফিলি। প্রকৃতির এ এক অবিশ্বাস্য অভিযোজন ক্ষমতা। 

পরাগায়নকারি হিসেবে স্কিঙ্ক

নানা ধরনের স্কিঙ্ক রয়েছে। যেমন- নরোনহা স্কিঙ্ক (Trachylepis atlantica) এবং নিউজিল্যান্ড স্কিঙ্ক। তারা মধু খাওয়ার জন্য ফুলের প্রতি আকৃষ্ট হয়। মধু সংগ্রহের সময় তাদের মাথা, নাক, পিঠ এবং অঙ্গ ফুলের পরাগরেণু এবং স্টিগমাগুলির সাথে ঘষে। ফলে পরাগরেণু লেগে থাকে।  যখন তারা অন্য ফুলে যায় তখন পরাগায়ন ঘটে।

কিছু কিছু ক্ষেত্রে স্কিঙ্করা ফুলের কাঠামোর পরিবর্তন করে মধু সংগ্রহের চেষ্টা করে। ফলে অন্যান্য অন্যান্য পরাগায়নকারির কাজ সহজতর হয়। উদাহরণস্বরূপ, তাসমানিয়ার স্নো স্কিঙ্ক রিচিয়া স্কোপারিয়া (Richea scoparia) উদ্ভিদের পাপড়ি ছিঁড়ে ফেলে (নীচের চিত্র দেখুন)। এতে ফুলের প্রজনন অঙ্গগুলি উন্মুক্ত হয় এবং পোকামাকড়কে পরাগায়ন করার পথ সহজ করে দেয় ।

পরাগায়ন সম্পর্কে আরো জানতে নীচের  লিঙ্কসমূহে ক্লিক করতে পারেন-

মাছির মাধ্যমে পরাগায়ন, পাখি  ‍কর্তৃক পরাগায়ন, এবং বাম্বল মৌমাছি দিয়ে পরাগায়ন 

 

স্তন্যপায়ি পরগায়কারির জন্য হুমকি আছে কী?

দক্ষিণ আফ্রিকার গুল্ম-লেজযুক্ত ইঁদুর থেকে শুরু করে অস্ট্রেলিয়ার মধু পোসাম পর্যন্ত ছোট স্তন্যপায়ী পরাগায়নকারীদের বেঁচে থাকা ক্রমশ অনিশ্চিত হয়ে যাচ্ছে। যেহেতু এই প্রাণীগুলি মাটিতে বাস করে বা একটি নির্দিষ্ট বনে বাস করে, তাই তারা নির্দিষ্ট হুমকির মুখোমুখি হয় যা মৌমাছি বা পাখির মতো ডানাযুক্ত পরাগায়নকারীদের ক্ষেত্রে ঘটে না। চলুন দেখি কি ধরনের হুমকি রয়েছে- 

বাসস্থান বিভাজন

  • স্তন্যপায়ী প্রাণীরা পাখি বা মৌমাছির মতো মহাসড়ক, শহরতলির বেড়া বা পরিষ্কার মাঠের উপর দিয়ে উড়তে পারে না।
    হুমকি: যখন একটি বনের কিছু এলাকা পরিষ্কার হয়ে যায়, তখন ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণীরা দ্বীপের মতো জায়গায় আবদ্ধ হয়ে পড়ে। যদি তারা পার্শ্ববর্তী অংশে অবস্থিত গাছের ফুলে পৌঁছাতে না পারে, তবে পরপরাগায়ন হয় না। ফলে বাগানের গাছের গুণগত মাণ কমে যায় বা বাগানের গাছের সংখ্যা কমতে থাকে। 
  • ফলাফল: উদ্ভিদ বংশবৃদ্ধি করে দুর্বল বীজ উৎপাদনের মাধ্যমে। অন্যদিকে স্তন্যপায়ী প্রাণীরা জিনগত বৈচিত্র্যের অভাবে স্থানীয় বিলুপ্তির মুখোমুখি হয়।

আক্রমণাত্মক শিকারী

ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণীরা স্থানীয় শিকারী প্রাণীদের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট প্রতিরক্ষামূলক আচরণ গড়ে তুলতে পারে, কিন্তু তারা প্রবর্তিত প্রজাতির বিরুদ্ধে প্রায়শই অসহায় থাকে।

  • হুমকি: অস্ট্রেলিয়া এবং মাদাগাস্কারে বন্য বিড়াল, ইঁদুর এবং শিয়াল ছোট ছোট মধু পানকারি স্তন্যপায়ী প্রাণীদের প্রচুর পরিমাণে শিকার করে খায়।
  • প্রভাব: একটি আক্রমণাত্মক শিকারী স্থানীয় পরাগায়নকারিদেরকে নি:শেষ করে দিতে পারে। যেমন- পিগমি পোসাম নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে যদি স্থানীয় উদ্ভিদ প্রজনন বন্ধ করে দেয়।

জলবায়ু-প্রকৃতিবিদ্যার অমিল

উদ্ভিদ এবং তাদের স্তন্যপায়ী পরাগায়নকারীরা সঠিক সময়ের উপর নির্ভর করে তাদের কার্যাদি সম্পন্ন করে। এর ব্যতিক্রম হলে সমস্যা দেখা দেয়-

  • হুমকি: তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে বসন্তের শুরুতে ফুল ফুটতে পারে। কিন্তু স্তন্যপায়ী প্রাণীর শীতনিদ্রা বা প্রজনন চক্র দিনের দৈর্ঘ্যের সাথে সম্পর্কিত। ফলে জলবায়ুর পবির্তন ঘাত উভয়ের জন্যই সমস্যা বয়ে আনতে পারে।
  • ফলাফল: যখন স্তন্যপায়ী প্রাণী জেগে ওঠে বা বাচ্চাকে দুধ খাওয়ানোর জন্য উচ্চ শক্তির প্রয়োজন হয়, তখন মধু জানালা মানে ফুল তার কাজ শেষ করে ফেলে বন্ধ হয়ে যায়। ফলে প্রাণীটি অনাহারে থাকে এবং উদ্ভিদটি পরাগায়নবিহীন অবস্থার সম্মুখীন হয়। সপুষ্পক উদ্ভিদে পরাগায়ন না হলে বংশ বৃদ্ধিও সম্ভব নয়।

কৃষি রাসায়নিক প্রবাহ

কীটনাশক ব্যবহারে মৌমাছির ক্ষতি হয় এমন আলোচনা বেশ প্রচলিত। তবে ছোট ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণীরাও যে রাসায়নিকের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল তা আমরা অনেক সময় বিবেচনায় নিই না।

  • হুমকি: যেহেতু ইঁদুর এবং মার্সুপিয়ালরা প্রায়শই তাদের পশম জিহ্বা দিয়ে পরিচর্যা করে, সেহেতেু ফুলের উপর জমে থাকা এবং তাদের পশমের সাথে লেগে থাকা যেকোনো কীটনাশক তাদের পেটের ভিতর চলে যায়।
  • ফলাফল: নানান রকমের স্নায়ুবিক ব্যাধি ও প্রজননে সমস্যা হওয়ার সম্ভনা থাকে।

ভবিষ্যতের জন্য কৌশলগত সমাধান

বেশ কিছু ধরনের কৌশল অবলম্বন করে এসকল ছোট ছোট স্তন্যপানকারি প্রাণীদেরকে রক্ষা করা যেতে পারে- 

সবুজ করিডোর এবং বন্যপ্রাণী সেতু স্থাপন

বিভাজন মোকাবেলায় সংরক্ষণবাদীরা বিশেষায়িত সেতু এবং টানেল তৈরি করছেন। আসুন আমরাও তাদেরকে সাহায্য করি। খণ্ডিত বনাঞ্চলকে সংযুক্ত করে এমন স্থানীয় উদ্ভিদের সারি লাগানো যেতে পারে। ফলে স্তন্যপায়ী প্রাণীদের খাদ্য উৎসের মধ্যে নিরাপদে চলাচল করতে পারবে। কিছু অঞ্চলে গ্লাইডারের মতো পরাগায়নকারীদেরকে রাস্তা পার হতে সাহায্য করার জন্য দড়ির সেতু তৈরি করা উচিৎ।

পাশবিকতা-মুক্ত অভয়ারণ্য

এ ধরনের ব্যবস্থাপনার জন্য বেড়াযুক্ত সংরক্ষণাগার তৈরি করা। বেড়াযুক্ত এলাকা থেকে আক্রমণাত্মক শিকারীকে সরিয়ে দিলে ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণীরা তাদের প্রাকৃতিক ঘনত্বে ফিরে আসতে পারে। এতে বাস্তুতন্ত্রের ঐতিহাসিক পরাগায়ন ভারসাম্য পুনরুদ্ধার হবে।

কৃষি নীতিতে থেরোফিলিকে একীভূত করা

 খামারের চারপাশে স্থানীয় বন বৃদ্ধির জন্য বাফার স্ট্রিপ রেখে ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণীদের আবাসস্থল তৈরি করা। এই স্তন্যপায়ী প্রাণীরা কীভাবে কিছু বাণিজ্যিক ফসলের পরাগায়নে সাহায্য করতে পারে তা নিয়ে গবেষণা চলছে, বিশেষত যেগুলি হাত দিয়ে পরাগায়ন করতে গেলে তা ব্যয়বহুল হয়। তদুপরি ইঁদুরকে শুধুমাত্র ক্ষতিকর প্রাণী হিসেবে নয়, বরং অংশীদার হিসেবে দেখতে উৎসাহিত করতে হবে কৃষকদেরকে।

পুনর্নির্মাণ এবং স্থানান্তর

যদি কোনও নির্দিষ্ট উদ্ভিদের ক্ষেত্রে তার জহন্পয প্রযোজ্য পরাগায়নকারী না থাকে, তবে বনের প্রজনন চক্র শুরু করার জন্য অন্য এলাকা থেকে সুস্থ স্তন্যপায়ী প্রাণী সেই অঞ্চলে স্থানান্তর করা যেতে পারে।

লুকানো গিল্ডকে কীভাবে রক্ষা করবেন?

পশমযুক্ত এবং আঁশযুক্ত স্তন্যপায়ি পরাোয়নকারিদেরকে আমরা কিভাবে দেখি তার উপর নির্ভর করে তাদের বেঁচে থাকা। আমরা যদিও মৌমাছিদের বাঁচাতে শিখেছি, এখন থাবাযুক্ত প্রাণীদেরকে রক্ষা করার সময়। গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত স্থপতিদেরকে আপনি কীভাবে সংরক্ষণে অবদান রাখতে পারেন তা এখানে আলোচনা করা হলো:

কীটপতঙ্গ দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন

ছোট স্তন্যপায়ী পরাগায়নকারিদের সবচেয়ে বড় হুমকি হলো তাদেরকে ক্ষতিকর প্রাণী হিসেবে চিহ্নিত করা। অনেক বাস্তুতন্ত্রে আপনার বাগানে যে ইঁদুর বা শ্রু দেখতে পান তা স্থানীয় ফুলের জীববৈচিত্র্যের মূল চাবিকাঠি। এদেরকে টিকিয়ে রাখার জন্য আপনি যা করতে পারেন তা হলো প্রাণঘাতী ফাঁদ বা ইঁদুরনাশক ব্যবহার না করা। কীটনাশকের ব্যবহারের ফলে সেকেন্ডারি বিষক্রিয়ায় প্রায়শই শিকারী পেঁচা এবং বাজপাখি মারা যারা। পেঁচা ও বাজপাখি বেঁচে থাকলে প্রাকৃতিকভাবে ইঁদুরের  জনসংখ্যার ভারসাম্য বজায় থাকে।

আপনার গৃহপালিত শিকারিদেরকে নিয়ন্ত্রন করুন

গৃহপালিত পোষা প্রাণীসহ আক্রমণাত্মক প্রজাতিগুলি ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণীর সংখ্যা হ্রাসের একটি প্রধান কারণ। এক্ষেত্রে আপনি যা করতে পারেন তা হলো প্রাকৃতিক উর্বরভূমি, বন বা পার্কের কাছাকাছি আপনার বসতি হরে হলে বিড়ালদেরকে ঘরের ভিতরে রাখুন, বিশেষ করে রাতে যখন বেশিরভাগ থেরোফিলাস পরাগায়নকারী সক্রিয় থাকে। ক্যাটিও এনক্লোজার বা উজ্জ্বল রঙের কলার ব্যবহার করুন যা ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণীদের পালাতে দ্বিগুণ সময় দেয়।

আপনার উঠোনের সংযোগ পুনরুদ্ধার করুন

নিখুঁতভাবে সাজানো লন ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণীর জন্য মরুভূমি। এটি শিকারীদের থেকে কোনও আড়াল দেয় না এবং খাদ্য উৎসগুলির মধ্যে চলাচলের জন্য কোনও করিডোর দেয় না। এমন অবস্থায় আপনি যা করতে পারেন তা হলো "বন্য-স্কেপিং" অনুশীলন করুন। আপনার বাগানের একটি কোণে পাতার আবর্জনা, পতিত কাঠ এবং স্থানীয় মাটির আচ্ছাদিত গাছপালা রাখুন। এটি ছোট প্রাণীদেরকে আবাসস্থল প্রদান করে।

সবুজ অবকাঠামোর পক্ষে কথা বলুন

ব্যক্তিগত পদক্ষেপ শক্তিশালী; কিন্তু পদ্ধতিগত পরিবর্তন অপরিহার্য। বন্যপ্রাণী করিডোরকে অগ্রাধিকার দেয় এমন স্থানীয় এবং জাতীয় নীতিগুলিকে সমর্থন করুন। যখন নতুন রাস্তা বা উন্নয়ন পরিকল্পনা করা হয় তখন আন্ডারপাস এবং সবুজ সেতু তৈরির পক্ষে কথা বলুন। এতে যে সকল প্রাণী উড়তে পারে না তাদের জন্য উপকারি। একটি রাস্তার জন্য কোনও উদ্ভিদ প্রজাতির ধ্বংস কাম্য হতে পারে না। 

নাগরিক বিজ্ঞানে অংশগ্রহণ করুন

বিজ্ঞানীরা সর্বত্র থাকতে পারবেন না, কিন্তু নাগরিকরা পারেন। আপনি iNaturalist এর মতো অ্যাপ ব্যবহার করুন অথবা স্থানীয় জৈব-ব্লিটজে যোগদান করে ফুল দেখতে আসা ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণীর দেখা রেকর্ড করুন। ফুলের উপর ইঁদুর বা টিকটিকির ছবি তোলা অমূল্য তথ্য প্রদান করে যা গবেষকদের পরাগায়ন নেটওয়ার্ক ম্যাপ করতে এবং কোন আবাসস্থলগুলির জরুরি সুরক্ষা প্রয়োজন তা সনাক্ত করতে সহায়তা করে।

উপসংহার

থেরোফিলির উপকারিতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আমাদের গ্রহের স্বাস্থ্য কেবল ক্যারিশম্যাটিক বা স্পষ্টভাবে যা দেখা যায় তার উপর নির্ভর করে না। দক্ষিণ আফ্রিকার বিয়ার-সুগন্ধযুক্ত ফুল থেকে শুরু করে মাদাগাস্কারের লেমুর পর্যন্ত উড়ন্ত পরাগায়নকারি তাদের নিজ নিজ আবাসস্থলে নীরবে কাজ করে যাচ্ছে। 

তবে এই প্রাণীগুলি দুর্বল। ফলে রাস্তা এবং খামার দ্বারা বন ভেঙে ফেলা তাদের জন্য একটি মৃত্যু ঘন্টা। যখন আমরা ইঁদুর, শ্রু বা লিমুর হারিয়ে ফেলি, তখন আমরা কেবল একটি প্রজাতি হারাই না; আমরা উদ্ভিদ জগতের জিনগত বৈচিত্র্য বজায় রাখার জন্য কুরিয়ার পরিষেবা হারাই।

লুকানো গিল্ড রক্ষা করার জন্য সংরক্ষণ প্রচেষ্টা প্রসারিত করতে হবে। ফুলটি বাঁচাতে আমাদের প্রথমে পশমযুক্ত, আঁশযুক্ত এবং চার পায়ের নায়কদের রক্ষা করতে হবে যারা পৃথিবীকে প্রস্ফুটিত রাখে।

FAQs

ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী দ্বারা পরাগায়িত ফুল কেন মিষ্টি সুগন্ধির পরিবর্তে "বাসি বিয়ার" বা "ইস্ট" এর মতো গন্ধ ছড়ায়?

ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণীদের, বিশেষ করে ইঁদুরদের, একটি সংবেদনশীল প্রোফাইল থাকে যা ফল, ছত্রাক এবং বীজের মতো উচ্চ-শক্তির খাদ্য উৎসগুলিকে অগ্রাধিকার দেয়। তারা খামিরযুক্ত বা টক গন্ধ পছন্দ করে। এ ধরনের গন্ধ ইঁদুর বা শ্রুর সংবেদনশীল ঘ্রাণশক্তির জন্য একটি রাসায়নিক বাতিঘর হিসাবে কাজ করে।

জিওফ্লোরি কী এবং এটি কীভাবে অন্যান্য প্রজাতির পরাগায়নে হস্তক্ষেপ প্রতিরোধ করে?

জিওফ্লোরি বলতে সেই বৈশিষ্ট্যকে বোঝায় যেখানে উদ্ভিদ মাটির স্তরে বা নীচে ফুল উৎপাদন করে। এটি পরাগায়ন নিশ্চিত করার জন্য একটি বিবর্তনীয় কৌশল।েএ ধরনের উদ্ভিদ ময়লা বা পাতার আবর্জনায় ফুল লুকিয়ে রেখে পাখি এবং উড়ন্ত পোকামাকড়কে মধু খেতে বাধা দেয়। কারণ তারা পরাগায়নে সাহায্য করে না। এমন ব্যবস্থা নিশ্চিত করে যে, কেবলমাত্র মাটিতে বসবাসকারী স্তন্যপায়ী প্রাণীরা, যারা অনেক পরিমাণে পরাগ বহনে তারা ফুলে পৌঁছাতে পারে।

হানি পোসামের ব্রাশ-টং কীভাবে প্রকৃতির অভিসারী বিবর্তনের সেরা উদাহরণগুলির মধ্যে একটি?

অস্ট্রেলিয়ায় হানি পোসাম (Tarsipes rostratus) এর জিহ্বার ডগায় প্যাপিলি নামক সূক্ষ্ম, লোমের মতো প্রোটিউবারেন্স রয়েছে। মার্সুপিয়াল হওয়া সত্ত্বেও ফুলের লম্বা টিউব থেকে কীভাবে দক্ষতার সাথে তরল মধু গ্রহণ করা যায় তা বিবর্তনের মাধ্যমে গঠিত হয়েছে। ফলে তারা পাখি এবং বাদুড়ের মতো একই জৈবিক সমাধানে পৌঁচেছে।

কিছু নির্দিষ্ট জলবায়ুতে পোকামাকড়ের চেয়ে ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণীরা কি ভালো পরাগায়নকারী হতে পারে?

হ্যাঁ, হতে পারে। ইথিওপিয়ার উচ্চ-উচ্চতার পাহাড় বা দক্ষিণ আফ্রিকার বাতাস-প্রবাহিত হিথের মতো চরম পরিবেশে পোকামাকড়ের কার্যকলাপ প্রায়শই ঠান্ডা তাপমাত্রা বা উচ্চ বাতাস দ্বারা সীমাবদ্ধ থাকে। মৌমাছিরা যখন কাজ করতে অক্ষম, তখন ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণীরা ঠান্ডা রাতে সক্রিয় থাকে। তাদের দেহের আকার অধিক পরিমাণে পরাগরেণু বহন করতে সাহায্য করে এবং পরাগায়নে সাহায্য করে।