ধর্ম ও নববর্ষ: এক ধরনের সংস্কৃতি
৩১শে ডিসেম্বর মধ্যরাতে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ উদযাপনে ফেটে পড়ে। তবুও আরো লক্ষ মানুষের জন্য আজকের রাতটি কেবল আরেকটি মধ্য-শীতের বুধবার। "নববর্ষ" ধারণাটি মানবজাতির সবচেয়ে আকর্ষণীয় সাংস্কৃতিক প্যারাডক্সগুলির মধ্যে একটি: এটি একটি সার্বজনীন আবেগ যা সম্পূর্ণ খেয়ালমাফিক তারিখের উপর ভিত্তি করে তৈরি.
নববর্ষের তারিখের বৈচিত্র্য কোনও ঐতিহাসিক দুর্ঘটনা নয়। এটি বিভিন্ন সভ্যতা কীভাবে মহাবিশ্বের জটিল গাণিতিক ধাঁধা সমাধান করেছে তার প্রতিফলন। আমরা যখন তা উদযাপন করি, তখন তা বোঝার জন্য আমাদেরকে জ্যোতির্বিদ্যা, কৃষিক্ষেত্র এবং সর্বোপরি আমদের বেঁচে থাকার প্রয়োজনীয় সংযোগস্থলের দিকে নজর দিতে হবে।
সময়ের জ্যোতির্বিদ্যা: সৌর, চন্দ্র এবং চন্দ্র-সৌর গণিত
আমাদের নববর্ষের দিনগুলি ভিন্ন হওয়ার মূল কারণ হলো কোন সংস্কৃতির অসুসারিগণ কোন স্বর্গীয় নক্ষত্র অনুসরণ করতে পছন্দ করে তার উপর। মহাবিশ্ব এক বছরের জন্য একটি পরিষ্কার, পূর্ণ সংখ্যা প্রদান করে না।
সৌর বছর (সূর্য)
বিশ্বব্যাপী প্রশাসনিক কাজের জন্য বহুল ব্যবহৃত পন্জিকাটি হলো গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার/পন্জিকা। এটি একটি সৌর ক্যালেন্ডার। পৃথিবীকে সূর্যের চারপাশে একবার ঘূর্ণন সম্পন্ন করতে যে সময় লাগে তা পরিমাপ করে তৈরি করা হয় যা প্রায় ৩৬৫.২৪২১৯ দিন।
যেহেতু এটি একটি পূর্ণসংখ্যা নয়, তাই আমরা আমাদের ঋতুগুলি যাতে পরিবর্তন না হয় তার জন্য "লিপ ইয়ার" ব্যবহার করি।
চন্দ্রবর্ষ (চাঁদ)
অনেক সংস্কৃতিই চাঁদের পরিক্রমার উপর ভিত্তি করে চন্দ্র ক্যালেন্ডার পছন্দ করে। একটি চন্দ্র মাস প্রায় ২৯.৫ দিন। বারোটি চন্দ্র মাস যোগ করলে প্রায় ৩৫৪ দিন হয়। এর ফলে সৌরচক্রের তুলনায় প্রতি বছর ১১ দিনের ব্যবধান তৈরি হয়। এই কারণেই ইসলামিক নববর্ষ ৩৩ বছরের চক্রে গ্রেগরিয়ান ঋতুর হিসাব থেকে দূরে সরে যায়।
লুনিসোলার হাইব্রিড
চাঁদের মাসগুলিকে কৃষি ঋতুর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখার জন্য চীনা এবং হিব্রু ক্যালেন্ডার লুনিসোলার পদ্ধতি ব্যবহার করে। তারা প্রতি কয়েক বছর অন্তর একটি "ইন্টারক্যালারি" বা ১৩তম মাস যোগ করে যাতে নববর্ষ সর্বদা একটি নির্দিষ্ট ঋতু চক্রের মধ্যে থাকে (যেমন বসন্ত বিষুব বা শরৎকালিন ফসল কাটা)।
"চিরন্তন প্রত্যাবর্তনের" দর্শন
আমাদের কেন নতুন বছরের প্রয়োজন হয়? মনোবিজ্ঞানীরা একে নতুন শুরুর প্রভাব বলে থাকেন। মানুষ তাদের ভুলের চলমান মাশুল কমানোর জন্য লড়াই করে। নতুন বছরের মতো সাময়িক অবস্থা আমাদেরকে অতীতের ব্যর্থতাগুলিকে ঝেড়ে ফেলে নতুন প্রেরণার সাথে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে।
ধর্মের ইতিহাসবিদ মির্সিয়া এলিয়াডের ভাষায় নতুন বছর একটি "চিরন্তন প্রত্যাবর্তনের মিথ" উপস্থাপন করে। এটিকে পৃথিবীর একটি আনুষ্ঠানিক পুনর্জন্ম হিসেবে দেখা হয়, যেখানে সময় সরল রেখা নয় বরং একটি বৃত্তাকারে আমাদের বিশুদ্ধতা এবং অসীম সম্ভাবনার অবস্থায় ফিরিয়ে আনে।
সাতটি প্রভাবশালী সাংস্কৃতিক উৎসব
প্রতিটি প্রধান নববর্ষ উদযাপন একটি অনন্য পৌরাণিক কাহিনী দ্বারা স্থাপিত হয় যা অন্ধকার থেকে আলোতে, অথবা পুরাতন থেকে নতুনতে রূপান্তর ব্যাখ্যা করে।
গ্রেগরিয়ান নববর্ষ (১লা জানুয়ারী)
- ভিত্তি: স্থির সৌর ভিত্তিক।
- পৌরাণিক কাহিনী: রোমান দেবতা জানুস অনুযায়ি নববর্ষের হিসার করা হয়; যেখানে তিনি শুরু, প্রবেশদ্বার, রূপান্তর এবং শেষের দেবতা হিসেবে চিত্রিত। জানুসকে দুটি মুখ দিয়ে চিত্রিত করা হয়েছে- একটি অতীতের দিকে ফিরে তাকাচ্ছে এবং অন্যটি ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আছে। খ্রিস্টপূর্ব ৪৬ সালে জুলিয়াস সিজার "প্রবেশপথের" দেবতাকে সম্মান জানাতে ১লা জানুয়ারীকে বছরের শুরু হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
- উদযাপন: কাউন্টডাউন অনুষ্ঠান- পুরাতনকে "ভয় দেখানোর" জন্য আতশবাজি এবং অল্ড ল্যাং সাইনের (Auld Lang Syne) গান গাওয়া হয়।
চন্দ্র নববর্ষ/বসন্ত উৎসব (চুনজি)
- ভিত্তি: চন্দ্র-সৌর (২১ জানুয়ারী থেকে ২০ ফেব্রুয়ারির মধ্যে পতন)।
- পৌরাণিক কাহিনী: নিয়ানের কিংবদন্তি, একটি ভয়ঙ্কর জন্তু যা সমুদ্র থেকে বেরিয়ে এসে গ্রামবাসী এবং গবাদি পশুদের খেয়ে ফেলত। গ্রামবাসীরা আবিষ্কার করেন যে, জন্তুটি লাল রঙ এবং তীব্র শব্দে ভীত ছিল।
- উদযাপন: আজ লাল লণ্ঠন বাতি, লাল খাম (Hongbao) এবং বিস্ফোরক আতশবাজির ব্যাপক ব্যবহার করা হয় যাতে আগামী বছর দুর্ভাগ্যের "জন্তু" দূরে থাকে।
নওরোজ (পারস্য নববর্ষ)
- ভিত্তি: সৌর বিষুব (মার্চ ২০/২১)।
- পৌরাণিক কাহিনী: এই অনুষ্ঠানটি কিংবদন্তি পারস্য রাজা জামশিদের সাথে সম্পর্কিত। পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে জামশিদ মানবজাতিকে এমন এক শীত থেকে রক্ষা করেছিলেন যা সমস্ত জীবন্ত প্রাণীকে হত্যা করেছিল। বসন্তের প্রথম দিনে যখন তিনি তাঁর সিংহাসনে আরোহণ করেন, তখন সূর্য এত উজ্জ্বলভাবে আলোকিত হয়েছিল যে এটি একটি "নতুন দিন" (নওরোজ) তৈরি করেছিল।
- উদযাপন: হাফত-সিন টেবিলের স্থাপন, যার মধ্যে 'S' অক্ষর দিয়ে শুরু হওয়া সাতটি আইটেম রয়েছে, প্রতিটি পুনর্জন্ম, স্বাস্থ্য এবং সমৃদ্ধির প্রতীক।
রোশ হাশানাহ (ইহুদি নববর্ষ)
- ভিত্তি: চন্দ্র-সৌর (সেপ্টেম্বর/অক্টোবর)।
- পৌরাণিক কাহিনী: এটি প্রথম পুরুষ ও মহিলা আদম ও হাওয়া সৃষ্টির বার্ষিকী উপলক্ষে উৎযাপন করা হয়। এটিকে "বিচারের দিন" হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যেখানে ঈশ্বর "জীবনপুস্তকে" আগামী বছরের জন্য প্রতিটি ব্যক্তির ভাগ্য লিপিবদ্ধ করেন।
- উদযাপন: আত্মাকে "জাগিয়ে তোলার" জন্য শোফার (মেষের শিং) বাজানো এবং মধুতে ডুবানো আপেল খাওয়া হয় যাতে সামনের বছরটি মধুর হয়।
হিজরি নববর্ষ (ইসলামী নববর্ষ)
- ভিত্তি: বিশুদ্ধ চন্দ্র।
- পৌরাণিক কাহিনী: এটি ৬২২ খ্রিস্টাব্দে মক্কা থেকে মদিনায় নবী হযরত (সঃ) মুহাম্মদের হিজরতকে স্মরণ করে। এই ঘটনাটি প্রথম ইসলামী রাষ্ট্রের সূচনা এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য একটি নতুন যুগের সূচনা করে।
- উদযাপন: এটি অন্যান্য নববর্ষের মতো নয়। বরং প্রায়শই উচ্ছ্বসিত পার্টির পরিবর্তে ঐতিহাসিক স্মৃতিকে নীরবে স্মরন করা ও প্রার্থনা করা।
বৈশাখী/পুথান্ডূ (ভারতীয় সৌর নববর্ষ)
- ভিত্তি: সৌর (এপ্রিলের মাঝামাঝি)।
- পৌরাণিক কাহিনী: হিন্দু ঐতিহ্যে অনুযায়ি এটি সেই দিনটিকে চিহ্নিত করে যখন দেবী গঙ্গা পূর্বপুরুষদের আত্মাকে পবিত্র করার জন্য পৃথিবীতে অবতরণ করেছিলেন। শিখদের জন্য এটি ১৬৯৯ সালে খালসার জন্মকে স্মরণ করে, যা আধ্যাত্মিক ও শারীরিক মুক্তির একটি নির্দিষ্ট মুহূর্ত।
- উদযাপন: প্রাণবন্ত শোভাযাত্রা (নগর কীর্তন), ঐতিহ্যবাহী নৃত্য (ভাংড়া) এবং পবিত্র নদীতে আনুষ্ঠানিক স্নান যা শুদ্ধিকরণের প্রতীক।
সংক্রান (থাই নববর্ষ)
- ভিত্তি: সৌর (১৩-১৫ এপ্রিল)।
- পৌরাণিক কাহিনী: কাবিলা ফ্রমের গল্প থেকে সৃষ্টি- একজন দেবতা যিনি একজন চালাক নশ্বর ব্যক্তির কাছে বাজি ধরে হেরে গিয়ে নিজের শিরশ্ছেদ করতে হয়েছিল। তার সাত কন্যা (সংক্রান মহিলা) প্রতি বছর পৃথিবীকে পুড়িয়ে ফেলা থেকে রক্ষা করার জন্য একটি মিছিলে পালাক্রমে তার মাথা বহন করে।
- উদযাপন: দেশব্যাপী বিশাল জলযুদ্ধ। থাইল্যান্ডের সবচেয়ে উষ্ণতম মাসে গত বছরের দুর্ভাগ্য ধুয়ে ফেলার জন্য এবং শীতল স্বস্তি আনতে জল ব্যবহার করা হয়।
উপসংহার: সর্বজনীন মানবিক আবেগ
প্রাচীন জ্যোতির্বিদ্যার গণনা এবং স্থানীয় পৌরাণিক কাহিনীর উপর ভিত্তি করে আমাদের ক্যালেন্ডারের তারিখগুলি পরিবর্তিত হলেও অন্তর্নিহিত দর্শন উল্লেখযোগ্যভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ব্যাংককে আমরা জল ছুঁড়ে ফেলছি, জেরুজালেমে ভেড়ার শিঙা বাজাচ্ছি, অথবা টাইমস স্কোয়ারে স্ফটিকের বলের পতন দেখছি, আমরা সকলেই একই মানবিক আচার-অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করছি।
আমরা বিশ্বাস করি যে, সময় কোনও বোঝা নয় যা আমাদেরকে টেনে নীচে নামায়, বরং একটি চক্র যা আমাদেরকে আরেকটি সুযোগ দেয় নিজেদের সৌভাগ্যকে ফেরানোর। বিশ্বের প্রতিটি কোণে নববর্ষ হলো সেই মুহূর্ত যেখানে আমরা সম্মিলিতভাবে "ছায়া" পিছনে ফেলে একটি নতুন দিনের আলোয় পা রাখতে সম্মত হই।