দেহের নীরব রক্ষী: ক্যান্সারের বিরুদ্ধে শরীর কীভাবে প্রতিরক্ষা বুহ্য তৈরি করে?

Category: Health & Wellness | Tags: No tags

Author: Jatish Chandra Biswas | Published on: November 16, 2025, 11:49 p.m.


বিকেলে যখন কাজল অনকোলজি ক্লিনিক থেকে বেরিয়ে এলো তখন তার কাছে মনে হলো পৃথিবীটা হঠাৎ করেই যেন শূন্য হয়ে গেছে, কোলাহল নেই; যেন এক খটখটে শুষ্ক মরুভূমি। গাড়ি চলছে, মানুষ গল্প করছে, সূর্যের সোনালী রঙে মেঘ হয়েছে রঙিন, তবুও সে কেবল একটি বাক্যের প্রতিধ্বনি ছাড়া আর কিছুই শুনতে পাচ্ছে না: "আমরা অস্বাভাবিক কোষ খুঁজে পেয়েছি।"

এই শব্দটা তার মনে ঠান্ডা ধোঁয়ার মতো গেঁথে গেল। সে গাড়িতে বসেছিল, স্টিয়ারিং হুইলে হাত দুটো সামান্য কাঁপছিল। সে সবসময় বিশ্বাস করতো যে, তার জীবন একটি যৌক্তিক ছন্দ অনুসরণ করে চলেছে। পর্যাপ্ত পরিমাণে খাওয়া, কঠোর পরিশ্রম করা, ব্যস্ত থাকা, ঘুমানো এবং সুখী থাকার চেষ্টা করা- সব কিছুই যেন মূল্যহীন! সে বুঝতে পারেনি যে, স্বাস্থ্য নামক বৃত্তের বাইরে সে বাস করছিল, ভিতরে নয়।

যত দিন যেতে লাগল, কাজল এক অপ্রত্যাশিত সত্য আবিষ্কার করল। চিকিৎসা অপরিহার্য ছিল এবং সে তাতে সম্পূর্ণরূপে নিবেদিতপ্রাণ ছিল। কিন্তু সে এটাও শিখেছিল যে, শরীরের একজন নিজস্ব নীরব অভিভাবক রয়েছে। শরীরের জটিল জৈবিক ব্যবস্থা রয়েছে যা শক্তিশালী, সমর্থিত এবং সুসংগত করা যেতে পারে। সে যত জ্ঞান আহরণ করতে থাকলো ততই সে উপলব্ধি করল:

শরীর বিশৃঙ্খলার যুদ্ধক্ষেত্র নয়; এটি বুদ্ধিমান সিস্টেমের একটি নেটওয়ার্ক, যা সঠিক পরিবেশ পেলে ব্যাপক মেরামত করতে সক্ষম। কাজল কীভাবে তার অভ্যন্তরীণ জীববিজ্ঞানকে সমর্থন করার জন্য শক্তিশালী, বিজ্ঞান-সমর্থিত উপায় খুঁজে পেয়েছিল তার গল্প নিয়ে আজ কথা বলবো। 

আপনিও কাজলের মতো আপনার জীবনধারা, খাদ্যাভ্যাস, পরিবেশ এবং আচরণে পরিবর্তন এনে দেখতে পারেন দেহের কোষীয় স্থিতিস্থাপকতা কীভাবে প্রভাবিত হয়। বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠিত। অনুশীলনগুলি সহজলভ্য। এবং গল্পটি, মানে কাজলের গল্প, অনেক ব্যক্তির নীরবে চলার যাত্রাকে প্রতিফলিত করতে পারে।

 

প্রথম উপলব্ধি হোক: ক্যান্সার শূন্যস্থানে জন্মায় না

কাজল তার প্রাথমিক গবেষণায়, "দ্য এম্পেরর অফ অল ম্যালাডিজ" বইয়ের লেখক ডঃ সিদ্ধার্থ মুখার্জির একটি গভীর উক্তি পেয়েছিলেন: "ক্যান্সার কেবল অবাঞ্চিত কোষের রোগ নয়; এটি সেই কোষগুলিকে ঘিরে থাকা সকলের জন্য একটি রোগ।"

এই ধারণা সবকিছু বদলে দেয়। ক্যান্সার কেবল "আবির্ভূত হয় না"। এটি বিপাক, প্রদাহ, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, জারণ চাপ এবং পরিবেশগত প্রভাব দ্বারা গঠিত জৈবিক পরিবেশ থেকে তৈরি হয়। 

কাজল শিখেছে যে, আমাদের দৈনন্দিন পছন্দগুলি যেমন- খাদ্য, ঘুম, অস্থিরতা, সূর্যালোক, চলাচল, ইত্যাদি জৈব রাসায়নিক সংকেত তৈরি করে এবং আমাদের দেহের ভিতরের সকল কিছুকেই প্রভাবিত করে।

না, এটা কোন জাদুকরী চিন্তাভাবনা ছিল না। এটি ছিল কয়েক দশক ধরে উদ্ভাবিত কোষ বিদ্যার উন্নতি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পর্কে জানার উপর ভিত্তি করে তৈরি জ্ঞানভান্ডার। 

আমরা যা ধারণা করি তার চেয়েও বেশি প্রতিনিধিত্ব রয়েছে রোগ তৈরি বা রোগ সারানোর ক্ষেত্রে। এটা শুধু মাত্র ক্যান্সারের অস্তিত্বের উপর নয়, বরং অভ্যন্তরীণ পরিবেশের উপর প্রভাব বিস্তার করে শরীরের শক্তিকে সমর্থন করতে পারে অথবা বাধা দিতে পারে।

 

চিনির ফাঁদ থেকে মুক্তি: পরিশোধিত খাবার কীভাবে শরীরের অভ্যন্তরকে বিকৃত করে

পরিশোধিত চিনি ইনসুলিন নিৎসরন বৃদ্ধি করে, প্রদাহকে জ্বালানি জোগায় এবং বিপাকীয় ভারসাম্য ব্যাহত করে। প্রক্রিয়াজাত খাবারের পরিমাণ কমানো শক্তিকে স্থিতিশীল করে, সুস্থ কোষকে সমর্থন করে এবং দেহকোষের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির যাতে না হয় তার জন্য জৈব রাসায়নিক পদার্থ তৈরি করে।

কাজল প্রথমেই যে বিষয়গুলো অন্বেষণ করেছিলো তার মধ্যে একটি ছিল পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট এবং অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার। এগুলো আধুনিক খাদ্যতালিকায় প্রাধান্য পায়। আমরা খুব মজা করে খেয়ে থাকি, বিপদ নিয়ে মাথা ঘামাই না!

পরিশোধিত খাবার কেন আমাদের ধারণার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ?

পরিশোধিত শর্করা দ্রুত হজম হয়। ফলে রক্তপ্রবাহে গ্লূকোজ দ্রুত বৃদ্ধি পায়। ক্যান্সার কোষগুলি ওয়ারবার্গ ইফেক্ট (Warburg effect) নামক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তৈরি গ্লূকোজকে অগ্রাধিকার দেয়। এই পদ্ধতিটি অ্যারোবিক গ্লাইকোলাইসিস নামেও পরিচিত (চিত্র নং- ১)। 

১৯২০ এর দশকে এই বিপাকীয় পরিবর্তন প্রথম বর্ণনা করেন অটো ওয়ারবার্গ (Otto Warburg)। এর মধ্যে রয়েছে পর্যাপ্ত অক্সিজেনের উপস্থিতিতেও গ্লুকোজ গ্রহণের উচ্চ হার এবং ল্যাকটেটে রূপান্তর।

তারপরও সমস্ত কার্বোহাইড্রেট বাদ দেওয়া প্রয়োজনীয় বা বাস্তবসম্মত নয়। তবে পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট কমানো বিপাকীয় স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে।

চিত্র নং- ১: স্বাভাবিক ডিফারেনশিয়াল এবং প্রসারণশীল টিস্যুতে শ্বসন 

 

কাজল কীভাবে তার পরিবর্তন শুরু করেছিল

সে চরমপন্থী হয়নি। বরং সে ধীরে ধীরে যা শুরু করেছিল তা হলো:

  • সাদা ভাতের পরিবর্তে বাদামী ভাত বা কুইনোয়া খাওয়া
  • প্যাকেজ করা মিষ্টির পরিবর্তে আস্ত ফল বেছে নেয়া
  • তাজা শাকসবজি বেশি করে রান্না করা
  • কৃত্রিমভাবে মিষ্টিযুক্ত পানীয় এড়িয়ে চলা
  • তৃপ্তি বৃদ্ধির জন্য স্বাস্থ্যকর চর্বি (জলপাই তেল, বাদাম, অ্যাভোকাডো) যোগ করা

কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সে অনুভব করল যে, তার শক্তি স্থিতিশীল হয়েছে, তার ক্ষুধা আরো স্থির হয়ে উঠেছে। তার মেজাজ উন্নত হয়েছে। খাওয়ার জন্য খাওয়া নয়, বরং দেহকে সমর্থনের জন্য খাওয়া।

 

বিপাকীয় মেরামত: মাইটোকন্ড্রিয়া, উপবাস এবং কোষীয় রিসেট সুইচ

কোষের কার্যকারিতা এবং তা প্রভাবিত করার ক্ষেত্রে মাইটোকন্ড্রিয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি ক্যান্সার কোষের সংকেত স্থানান্তর, বিস্তার, অ্যাপোপটোসিস নিয়ন্ত্রণ, আক্রমণ এবং স্থানান্তরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে টিউমার কোষের গ্লূকোজের মাত্রা শারীরবৃত্তীয় কার্যকারিতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ (চিত্র নং- ২)।

কাজল যখন প্রথম জানতে পারলেন যে, মাইটোকন্ড্রিয়া প্রদাহ, ডিএনএ সুরক্ষা এবং কোষের বেঁচে থাকার উপরও প্রভাব ফেলে, তখন তিনি অবাক হয়ে যান। প্রাগHতিহাসিক ব্যাকটেরিয়া থেকে সৃষ্ট এই ক্ষুদ্র অঙ্গগুলি বার্ধক্য এবং রোগে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে।

 

ক্যান্সারের ক্ষেত্রে মাইটোকন্ড্রিয়া কেন গুরুত্বপূর্ণ?

অকার্যকর মাইটোকন্ড্রিয়া নিম্নলিখিত বিষয়গুলির কারণ হতে পারে:

  • উচ্চ জারণ চাপ
  • বিঘ্নিত চর্বি বিপাক
  • বর্ধিত প্রদাহ
  • ডিএনএ মিউটেশনের প্রতি সংবেদনশীলতা

চিত্র নং- ২: মাইটোকন্ড্রিয়ার সহযোগীতায় টিউমার কোষের অগ্রগতি

 

সবিরাম উপবাস: শরীরের প্রাকৃতিক মেরামত

কাজল জানতে পারলো যে, সবিরাম উপবাস এবং পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস মাইটোকন্ড্রিয়াল দক্ষতা বৃদ্ধি করে, অটোফ্যাজি সক্রিয় করে এবং প্রদাহ কমায়। ফলে কোষীয় মেরামত, বিপাকীয় স্থিতিশীলতা এবং দীর্ঘস্থায়ী রোগের বিরুদ্ধে সামগ্রিক স্থিতিস্থাপকতা শক্তিশালী করে। 

তাই তিনি শুরুতে ১২ ঘন্টার জন্য রাতের খাবার পরিহার দিয়ে শুরু করে মাঝে মাঝে তা ১৪-১৬ ঘন্টা পর্যন্ত উপবাসের সময় বৃদ্ধি করেন।

উপবাসের সময় কী ঘটে?

  • ইনসুলিনের মাত্রা কমে যায়
  • মাইটোকন্ড্রিয়ালের দক্ষতা উন্নত হয়
  • অটোফ্যাজি সক্রিয় হয়, এবং
  • প্রদাহ হ্রাস পায়

খাদ্যের মাধ্যমে মাইটোকন্ড্রিয়াকে পুষ্ট করা

কিছু কিছু পুষ্টি উপাদান মাইটোকন্ড্রিয়াল কাজকে বৃদ্ধি করে। যেমন-

  • ওমেগা-৩ (মাছ, তিসি বীজ থেকে পাওয়া যায়)
  • পলিফেনল (সবুজ চা, বেরি)
  • ম্যাগনেসিয়াম
  • বি-ভিটামিন (আস্ত দানাদার খাবার, মটর শুটি, ইত্যাদি), এবং
  • CoQ10 (মাছের চর্বি, দানাদার খাবার)

কাজল ধীরে ধীরে তার খাদ্যাভ্যাসকে পরিবর্তন করে পুষ্টিকে প্রাধান্য দিতে থাকে। আসুন আমরাও তাই করি।

 

প্রকৃতির ঢাল: উদ্ভিদ থেকে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং ফাইটোকেমিক্যালস গ্রহণ

রঙিন উদ্ভিদ শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং ফাইটোকেমিক্যাল সমূহ সরবরাহ করে, যা জারণের প্রভাবকে নিরপেক্ষ করে, ডিএনএ কে রক্ষা করে, প্রদাহ নিয়ন্ত্রণ করে এবং দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য এবং রোগ প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজনীয় কোষীয় যোগাযোগকে শক্তিশালী করে।

রঙিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা

ফাইটোকেমিক্যাল সমূহ উৎপাদনের মাধ্যমে সূর্য, কীটপতঙ্গ এবং জারণ প্রভাব থেকে নিজেদের রক্ষা করে। যখন আমরা এগুলো খাই, তখন আমরা তাদের আণবিক প্রতিরক্ষা কৌশল উত্তরাধিকার সূত্রে পাই (https://www.ncbi.nlm.nih.gov/books/NBK92771/).

শক্তিশালী যৌগগুলির উৎস কী?

  • কারকিউমিন (হলুদ)
  • ইপিগ্যালোক্যাটেচিন গ্যালেট, EGCG (সবুজ চা)
  • রেসভেরাট্রল (আঙ্গুর)
  • কোয়েরসেটিন (পেঁয়াজ, আপেল)
  • সালফোরাফেন (ব্রোকলি স্প্রাউট)

কাজলের রান্নাঘরটি একটি ছোট ল্যাবে পরিণত হয়

সে কোনও বিদেশী সাপ্লিমেন্ট কিনত না। সে রান্না করত:

  • হলুদ এবং কালো মরিচ
  • দিনে দুবার সবুজ চা
  • রসুন এবং আদা
  • ব্লোবেরি, স্ট্রবেরি এবং লেবু জাতীয় ফল
  • জানালার ধারে সে ব্রোকলি স্প্রাউট ফলাতো

কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তার পাচনতন্ত্র হালকা অনুভূত হতে শুরু করে, তার প্রদাহের চিহ্নগুলি কমতে থাকে এবং তার মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি অনুভব করে। খাবার তখন রসায়নে পরিণত হয়েছিল- নিরাময় রসায়নে।

 

চিকিৎসা হিসেবে জীবনধারা: নড়াচড়া, সূর্যালোক এবং শ্বাস-প্রশ্বাস

নিয়মিত নড়াচড়া, প্রাকৃতিক সূর্যালোক এবং গভীর শ্বাস-প্রশ্বাস বিপাক নিয়ন্ত্রণ করে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে, সার্কাডিয়ান ছন্দের ভারসাম্য বজায় রাখে এবং মানসিক চাপের প্রতিক্রিয়া শান্ত করে। অর্থাৎ দৈনন্দিন অভ্যাসকে শক্তিশালী নিরাময় সংকেতে রূপান্তরিত করে।

নড়াচড়া শরীরের প্রাকৃতিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে

কাজলের সবচেয়ে আশ্চর্যজনক আবিষ্কারগুলির মধ্যে একটি ছিল- পেশীগুলি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিকারী অঙ্গ। এগুলোকে শক্তিশালী করে রোগ নিরাময় সম্ভব। নিয়মিত মাঝারি থেকে কঠিন ব্যায়াম দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ কমাতে, ইনসুলিন সংবেদনশীলতা উন্নত করতে এবং অস্বাভাবিক কোষের বিরুদ্ধে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে কার্যকর ভূমিকা রাখে। এর ফল পেতে কাজল যা করেছেন তা হলো:

  • সকালে হাঁটা
  • হালকা জগিং
  • যোগব্যায়াম
  • সপ্তাহে দুবার কঠিন প্রশিক্ষণ

আসুন, আমরাও কাজলের মতো এ ধরনের কাজগুলো করি ও সুস্থ থাকি।

 

সূর্যের আলো: ভিটামিন ডি-এর চেয়েও অধিক কার্যকরী 

সূর্যের আলো নাইট্রিক অক্সাইড তৈরি করে, সার্কাডিয়ান ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করে এবং মানসিক স্বাস্থ্যকে সমর্থন করে। বিশেষ করে ভিটামিন-ডি নিম্নলিখিত ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করে:

  • ইমিউন মড্যুলেশন
  • কোষের বিণ্যাস ঠিক করে
  • দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ হ্রাস করে

প্রতিদিন রোদে হাটুন ভিটামিন-ডি সাপ্লিমেন্ট নেওয়ার কোন প্রয়োজন হবে না, ঘুমের বড়ি খেয়ে ঘুমের ভাণ করতে হবে না। শারিরীক পরিশ্রমই হোক আপনার ওষুধ!

নির্মল বাতাসে শ্বাস ও স্নায়ুতন্ত্র নিয়ন্ত্রণ

দীর্ঘস্থায়ী শারিরীক বা মানসিক চাপ কোষের মেরামত ব্যাহত করে, প্রদাহজনক হরমোন বৃদ্ধি করে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে। এর থেকে মুক্তি পাওয়ার কী কোন উপায় নেই? আছে-

খোলা বাতাসে গভীর শ্বাস-প্রশ্বাস ভ্যাগাস স্নায়ুকে সক্রিয় করে, শরীরের লড়াই-বা-পলায়ন অবস্থাকে শান্ত করে। কাজেই প্রতিদিন গভীরভাবে শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ে কাজ করুন, নিজেকে সুস্থ রাখুন।

 

লুকানো ঝুঁকি: আয়রন অতিরিক্ত গ্রহণের চাপ, পরিবেশগত বিষাক্ত পদার্থ এবং নীরব ভারসাম্যহীনতা

আয়রন একটি গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান; তবে এটি গ্রহণের সঠিক মাত্রা বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ঘাটতি বা অতিরিক্ত উভয়ই স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। যদিও অক্সিজেন পরিবহন এবং শক্তি উৎপাদনের জন্য আয়রন অত্যাবশ্যক, তবুও শরীর কঠোরভাবে এর শোষণ এবং সঞ্চয় নিয়ন্ত্রণ করে।

আয়রন অতিরিক্ত গ্রহণ: শান্ত অক্সিডাইজার

আয়রন অপরিহার্য। কিন্তু অতিরিক্ত আয়রন মুক্ত র‍্যাডিকেল তৈরি করে, যা অক্সিডেটিভ স্ট্রেসকে বাড়ায়। তাই এটি অনেক দীর্ঘস্থায়ী রোগের ঝুঁকির কারণ। কাজল ফেরিটিন পরীক্ষার জন্য অনুরোধ করেছিল। কারণ আয়রনের ভূমিকা মানুষের দেহে যে ধরনের বিশেষ প্রভাব ফেলে তাকে হেলাফেলা করা যায় না। আপনিও পরীক্ষা করে দেখুন রক্তে আয়রনের মাত্রা সঠিক পরিমাণে আছে কি না।

পরিবেশগত বিষাক্ত পদার্থ এবং অন্তঃস্রাব বিঘ্নকারী উপাদান

কাজল দৈনন্দিন ঝুঁকি আবিষ্কার করেছেন। যেমন-

  • প্লাস্টিক (BPA, phthalates)
  • নন-স্টিক রান্নার জিনিসপত্র
  • কীটনাশক
  • কৃত্রিম রাসায়নিকযুক্ত ক্রিম, লোশন, ইত্যাদির

এ সকল পরিবেশ থেকে আমাদেরকে দূরে থাকতে চেষ্টা করতে হবে। তাই কাজল আতঙ্কিত হননি। তিনি কেবল ধীরে ধীরে জিনিসপত্র প্রতিস্থাপন করেছিলেন:

  • স্টেইনলেস স্টিলের বোতল
  • প্রাকৃতিক পরিষ্কারক
  • কাচের খাবারের পাত্র
  • সাশ্রয়ী মূল্যের জৈব পণ্য

ছোট পরিবর্তন, বড় জৈবিক প্রভাব।

ঘুম: চূড়ান্ত কোষ মেরামত চক্র

ঘুম হলো কোষ মেরামতের কারিগর। এটি হলো একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় যখন শরীর এবং মস্তিষ্ক প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণ, পুনরুদ্ধার এবং বর্জ্য অপসারণ প্রক্রিয়া সম্পাদন করে। বিষয়টি সামগ্রিকভাবে স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ঘুমের সময় কী ঘটে?

  • মেলাটোনিন একটি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে
  • ডিএনএ মেরামত এনজাইম সক্রিয় করে
  • ইমিউন কোষ পুনর্গঠন করে
  • মস্তিষ্ক থেকে বিপাকীয় বর্জ্য পরিষ্কার হয়

তবে ঘুমানোর জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়সূচীকে অগ্রাধিকার দিতে হবে: আলো ম্লান করা, মোবাইল, টিভি বন্ধ করা, ঘুমানোর আগে বই পড়া ফলে ঘুম হবে ঔষধ।

 

আবেগগত অবস্থা: মানসিকতা, আশা এবং কোষীয় জীববিজ্ঞান

ইতিবাচক আবেগ, মানসিক বা শারিরীক চাপ ব্যবস্থাপনা। মানসিক প্রশান্তি কর্টিসল হ্রাস করে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতায় ভারসাম্য বজায় রাখে এবং কোষীয় মেরামত উন্নত করে। আশাবাদী মানসিকতা এমন একটি জৈব রাসায়নিক অবস্থা তৈরি করে যা নিরাময় এবং স্থিতিস্থাপকতা বৃদ্ধি করে।

আমাদের মনে রাখতে হবে যে, ক্যান্সার কেবল একটি শারীরিক রোগ নয়, এটি মানসিক ব্যাধিও বটে। দীর্ঘস্থায়ী ভয় কর্টিসল নিঃসরণ বৃদ্ধি করে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ব্যাহত করে এবং মাইটোকন্ড্রিয়াল ফাংশনকে প্রভাবিত করে। কাজল বুঝতে পেরেছিল যে, তার শরীরকে সমর্থন করার অর্থ তার মনকেও সমর্থন করা।

তা হলে আমাদের কী করা উচিৎ? 

  • ধ্যান
  • ডায়েরি লেখা
  • মানসিক চিত্র অঙ্কন
  • অন্যকে সহায়তা করা
  • অর্থপূর্ণ কথোপকথন

প্রত্যাশা কোনও সরল আবেগ নয়, এটি একটি জৈব রাসায়নিক অবস্থা যা নিয়ন্ত্রণ, প্রশান্তি এবং স্থিতিস্থাপকতাকে উৎসাহিত করে।

 

কাজল যা শিখেছে: বল প্রয়োগ নয়, শরীর সহায়তায় সাড়া দেয়

জীববিজ্ঞানের সাথে লড়াই করার পরিবর্তে যখন আমরা পুষ্টি জোগাই তখন নিরাময় উন্নত হয়। জীবনযাত্রার সামান্য পরিবর্তন, যথা- ভালো খাবার, বিশ্রাম, নড়াচড়া এবং মানসিকতা শরীরকে স্বাভাবিকভাবে শক্তিশালী করতে এবং ভারসাম্যের সাথে সাড়া দিতে সাহায্য করে।

আপনার যাত্রা পথের দৃশ্য যেমন বদলে যায়, তেমনি আপনিও বদলে যেতে পারেন একজন রোগী হিসেবে নয়, বরং একজন ব্যক্তি হিসেবে। ঠিক যেমন করে কাজল বুঝতে পেরেছিল যে, 

  • সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা যায় না
  • কিন্তু নিজের জীববিজ্ঞানকে গভীরভাবে প্রভাবিত করা যায় 
  • নিরাময় রৈখিক নয়
  • শরীর শত্রু নয়, বরং একজন অংশীদার
  • সুস্থ্যভাবে বাঁচতে হলে শারিরীক ও মানসিক যত্ন নিতে হবে

 

আপনি অসুস্থতার মুখোমুখি বা দীর্ঘমেয়াদী সুস্বাস্থ্যের অধিকারি হলেও নীচের নীতিগুলি মেনে চলুন:

  • কোষগুলিকে খাওয়ান, 
  • প্রদাহ শান্ত করুন, 
  • মাইটোকন্ড্রিয়াকে সমর্থন করুন,
  • বিপাকের ভারসাম্য বজায় রাখুন, 
  • সময় মতো বিশ্রাম নিন, 
  • মনকে শক্তিশালী করুন, এবং
  • শরীরের সাথে অংশীদারিত্বে বেঁচে থাকুন।

 

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী

অস্বাভাবিক কোষ বৃদ্ধির বিরুদ্ধে শরীরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে কীভাবে প্রভাবিত করে?

একটি সুষম অন্ত্রের মাইক্রোবায়োম রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করতে, প্রদাহ কমাতে এবং পুষ্টির শোষণ উন্নত করতে সাহায্য করে। বিভিন্ন ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার এবং গাঁজনযুক্ত পণ্য অন্ত্রের বাস্তুতন্ত্রকে শক্তিশালী করে এবং পরোক্ষভাবে সুস্থ কোষীয় আচরণকে সমর্থন করে।

দীর্ঘস্থায়ী ঘুমের অভাব কি ক্যান্সার-সম্পর্কিত জৈবিক পথ পরিবর্তন করতে পারে?

হ্যাঁ। ক্রমাগত ঘুমের অভাব মেলাটোনিন উৎপাদন ব্যাহত করে, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস বাড়ায়, ডিএনএ মেরামত প্রক্রিয়াকে দুর্বল করে এবং প্রদাহজনক হরমোনগুলিকে বৃদ্ধি করে। ফলে শরীরের প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা দুর্বল হয়।

দীর্ঘস্থায়ী নীচু স্তরের প্রদাহ ক্যান্সারের ঝুঁকিতে কী ভূমিকা পালন করে?

চলমান প্রদাহ ক্ষতিকারক মুক্ত র‍্যাডিকেল তৈরি করে, কোষের সংকেত পরিবর্তন করে এবং মিউটেশনের ঝুঁকি বাড়ায়। খাদ্যাভ্যাস, চলাচল এবং চাপ ব্যবস্থাপনা এই নীরব প্রদাহজনক পটভূমি কমাতে পারে।

স্বাস্থ্যকর চর্বি কীভাবে বিপাকীয় স্থিতিশীলতায় অবদান রাখে?

ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড প্রদাহ কমায়, কোষের ঝিল্লির অখণ্ডতা বজায় রাখতে সাহায্য করে এবং মাইটোকন্ড্রিয়াল ফাংশন উন্নত করে। চর্বিযুক্ত মাছ, তিসির বীজ এবং আখরোট অস্বাভাবিক কোষ বৃদ্ধির জন্য প্রতিকূল বিপাকীয় অঞ্চল বজায় রাখতে সাহায্য করে।

ডিহাইড্রেশন কি কোষের স্থিতিস্থাপকতাকে প্রভাবিত করতে পারে?

হ্যাঁ। জলের অভাব রক্তকে ঘন করে, পুষ্টির পরিবহনকে ধীর করে দেয়, জারণ চাপ বাড়ায় এবং শরীর থেকে দূষিত পদার্থ বের হতে বাধাগ্রস্থ হয়। সঠিক পরিমানে জল গ্রহণ কোষের দক্ষতা এবং বর্জ্য অপসারণ ক্ষমতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।

সার্কেডিয়ান ছন্দ কী কোষের আচরণকে প্রভাবিত করে?

প্রবলভাবে প্রভাবিত করে থাকে। শরীর-ঘড়ি হরমোন নিঃসরণ, ডিএনএ মেরামত, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং বিপাক নিয়ন্ত্রণ করে। অনিয়মিত ঘুম, গভীর রাতে খাওয়া এবং টিভি, মোবাইল স্ক্রিনের আলো এই প্রতিরক্ষামূলক ছন্দগুলিকে ব্যাহত করতে পারে।

সামাজিক সংযোগ কীভাবে জৈবিক নিরাময়কে প্রভাবিত করে?

অর্থপূর্ণ সম্পর্কগুলি স্ট্রেস হরমোন কমায়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং মানসিক স্থিতিস্থাপকতা বাড়ায়। বিপরীতে, একাকীত্ব প্রদাহ বাড়ায় এবং অভিযোজিত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে।

শব্দ দূষণ কী কোষীয় স্তরে স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলতে পারে?

দীর্ঘস্থায়ী শব্দ কর্টিসল বৃদ্ধি করে, ঘুম ব্যাহত করে, রক্তচাপ বাড়ায় এবং জারণ চাপ বাড়ায়। শান্ত পরিবেশ এবং নিয়ন্ত্রিত শব্দ এক্সপোজার কোষ পুনরুদ্ধারে সহায়তা করে।

শরীরের গঠন কীভাবে অভ্যন্তরীণ স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলে?

অতিরিক্ত ভিসারাল ফ্যাট প্রদাহ সৃষ্টির রাসায়নিক পদার্থ তৈরি করে এবং ইনসুলিন এবং লেপটিনের মতো হরমোনগুলিকে ব্যাহত করে। সুস্থ শারিরীক গঠন বজায় রাখা বিপাকীয় সামঞ্জস্য এবং কোষীয় স্থিতিস্থাপকতা উন্নত করে।

সুস্থ কোষীয় কার্যকারিতা বজায় রাখতে গৌণ খনিজ পদার্থ কী ভূমিকা পালন করে?

জিঙ্ক, সেলেনিয়াম এবং ম্যাগনেসিয়ামের মতো খনিজ পদার্থ অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এনজাইম, ডিএনএ মেরামত, মাইটোকন্ড্রিয়াল শক্তি এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। ঘাটতি কোষীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দেয়।

 

উপসংহার

সন্ধ্যায় কাজল তার চিকিৎসা চক্র শেষ করে পার্কিং লটে ফিরে আসে যেখানে তার যাত্রা শুরু হয়েছিল। কিন্তু এবার সে সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু অনুভব করে- এক শান্ত শক্তি জ্বলন্ত অঙ্গারের মতো স্থির।

সে গভীরভাবে বুঝতে পেরেছিল:

আরোগ্য মানে যুদ্ধ করা নয়, এটি হলো সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করা যাতে শরীর উন্নতি করতে পারে।

আমাদের সকলেরই এমন একটি অভ্যন্তরীণ পরিবেশ তৈরি করার ক্ষমতা আছে যা স্থিতিস্থাপকতা, কোষীয় মেরামত এবং বিপাকীয় ভারসাম্যকে সমর্থন করে। জীবনধারা চিকিৎসার বিকল্প হতে পারে না। তবে বিজ্ঞান-সমর্থিত অনুশীলনগুলিকে প্রতিদিন লালন করলে শরীরের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা শক্তিশালী হয়।

কাজলের গল্প হাজার হাজার গল্পের মধ্যে একটি এবং সম্ভবত এটি আপনারও গল্প; অথবা গল্পের শুরু। আসুন অভ্যাস বদলাই ও সুস্থ থাকি।