সার্কভুক্ত দেশে কারা বেশি সিগারেট টানে আর কত কম মানে!

Category: Health & Wellness | Tags: No tags

Author: Jatish Chandra Biswas | Published on: November 9, 2025, 10:54 p.m.


ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বলে ব্যাপকভাবে পরিচিত। একটি জ্বলন্ত সিগারেট থেকে প্রায় ৭,০০০ টি রাসায়নিক পদার্থ নির্গত হয়। এদের মধ্যে কমপক্ষে ২৫০ টি বিষাক্ত বলে পরিচিত এবং কমপক্ষে ৬৯ টি ক্যান্সার রোগ সৃষ্টিতে অবদান রাখে।

তবুও বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষ এখনও ধূমপান করছে অথবা ত্যাগ করতে পারছে না। কেন এমন হয়? কারণগুলি কেবল "আমি এটি পছন্দ করি" বা "আমি জানি এটি খারাপ" এর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিষয়টি অনেক জটিল।

জীববিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান, সামাজিক চাপ, নিত্যনৈমিত্তিক কাজ, বিপণন এবং জীবনের ঘাত-প্রতিঘাতের সংমিশ্রণ এই অভ্যাসকে টিকিয়ে রাখে। এই প্রবন্ধে আমি ধূমপানের প্রধান চালিকা শক্তিগুলি অন্বেষণ করবো, বিশেষ করে সার্কভুক্ত দেশগুলোকে প্রাধান্য দিয়ে।

যে প্রশ্নগুলোর উত্তর জানা দরকার তা হলো- কেন মানুষকে ধূমপানের প্রতি আকৃষ্ট হয়, কোন অবস্থা তাদেরকে ধূমপানের দিকে ঠেলে দেয় এবং কীভাবে এই শক্তিগুলি একে অপরকে প্রভাবিত করে?

জৈবিক এবং রাসায়নিক আসক্তি

ধূমপানের পেছনে সবচেয়ে শক্তিশালী কারণ হলো তামাকের রাসায়নিক পদার্থ: নিকোটিন। যখন কেউ সিগারেটে এক টান মারে তখন নিকোটিন কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই মস্তিষ্কে পৌঁছে যায় (চিত্র নং- ১) এবং ডোপামিন (একটি "ভালো লাগার মতো" নিউরোট্রান্সমিটার) এবং অন্যান্য রাসায়নিক পদার্থ নিঃসরণ শুরু করে। আহা কি শান্তি!

চিত্র নং- ১: ধূমপানের পর রক্তে নিকোটিনের পরিমাণ

 

সময়ের সাথে সাথে মস্তিষ্ক অভিযোজিত হয়। যা একসময় আনন্দ দিত, তার কার্যকারিতা কমতে শুরু করে এবং ধূমপায়ী একই প্রভাব পেতে আরো বেশি করে ধূমপান করতে থাকে। এটিই আসক্তির শুরু

ধূমপানে বিরতি ও চলমান চক্র

যখন আসক্তি শুরু হয় তখন শরীরে নিকোটিনের মাত্রা কমতে শুরু করে এবং ধূমপায়ী সেই লক্ষণগুলি অনুভব করতে পারে বিরক্তি, অস্থিরতা, মনোযোগ দিতে সমস্যা, হতাশা বা উদ্বিগ্ন বোধ করার মাধ্যমে।

এমন অবস্থা দেখা দিলে আরেকটি সিগারেট খেলে সেই অপ্রীতিকর অনুভূতিগুলো থেকে মুক্তি পায়। তবে তা ক্ষণিকের তৃপ্তি। আসলে এ কুহকি মায়ার খেলা চলতেই থাকে। অর্থাৎ নেশার প্রতি একবার আসক্তি জন্মালে এটি ক্রমাগত ধূমপানের জন্য খুব শক্তিশালী এক চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে।

কিশোর কুমারের গাওয়া গানটির কথা কী আপনাদের মনে আছে?

এক টানেতে যেমন তেমন দু'টানেতে রোগী

তিন টানেতে রাজা উজির চার টানেতে সুখী

 

মনস্তাত্ত্বিক অভিপ্রায়

মানসিক স্বাস্থ্য, আচরণগত কারণ এবং ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্য ধূমপানের সাথে দৃঢ়ভাবে জড়িত।

মানসিক চাপ উপশম এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণ

অনেকেই উল্লেখ করেন যে, তারা মানসিক চাপ, উদ্বেগ বা নেতিবাচক অনুভূতি থেকে মুক্তি পেতে ধূমপান করে। ধূমপানের জন্য দূরে সরে যাওয়া, সিগারেট জ্বালানোর রীতি ও একটু বিরতি স্বস্তির মুহূর্ত বলে মনে করে।

কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে যে, দীর্ঘমেয়াদে ধূমপান মানসিক চাপের মাত্রা কমায় না। বরং ধূমপায়ীরা প্রায়শই বেশি চাপে থাকে। কারণ প্রত্যাহার-চক্র নিজেই উত্তেজনা সৃষ্টি করে ধূমপানের জন্য বাধ্য করে।

অভ্যাস, নৈমিত্তিক কাজ এবং ইঙ্গিত

ধূমপান প্রায়শই দৈনন্দিন কাজ এবং প্রেক্ষাপটের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ, খাবারের পরে এক কাপ কফির সাথে সিগারেট টানতে মজা লাগে, কাজের বিরতির সময় একটু আয়েশী টান, সামাজিকীকরণের সময় বা গাড়ি চালানোর সময় ধূমপানের ইচ্ছা জাগে।

যখন কোনও নির্দিষ্ট পরিস্থিতি ধূমপানের সাথে জড়িত হয়ে যায়, তখন সেই আচরণটি আলাদা করা খুব কঠিন। কারণ মস্তিষ্ক সেই প্রেক্ষাপটে নিকোটিনের প্রত্যাশা করতে শুরু করে। ফলে অভ্যাসটি স্থায়ী হয়ে যায়।

প্রতিচ্ছবি, বিদ্রোহ এবং পরিচয়

তরুণদের মধ্যে ধূমপান ভাবমূর্তির সাথে সম্পর্কিত হতে পারে- নিজেকে প্রাপ্তবয়স্ক দেখানো, একটি দলের সাথে মানানসই হওয়া, বিদ্রোহী হওয়া, শান্ত থাকা, ইত্যাদি কারণগুলো ধূমপানকে উৎসহিত করে। তাই দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে আইন ও পলিসি থাকা সত্বেও যুবাদের মাঝে ধূমপান বৃদ্ধি পাচ্ছে।

কেউ কেউ স্বাধীনতা বা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার ইঙ্গিত দেওয়ার জন্য ও কৌতুহল বশত ধূমপান শুরু করে (https://doi.org/10.1186/1471-2458-13-379)। তবে একবার ধূমপান শুরু করলে এর থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া অসম্ভব কঠিন।

সামাজিক এবং পরিবেশগত প্রভাব

ধূমপানের উপর সামাজিক ও পরিবেশগত প্রভাবের মধ্যে রয়েছে পরিবার ও সহকর্মীদের চাপ, বিজ্ঞাপন ও মিডিয়ার সংস্পর্শ এবং তামাক বিক্রেতাদের প্রলোভন, অধিক ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী সম্প্রদায় ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা।

সহকর্মীদের চাপ এবং সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা

যদি বন্ধু, সহকর্মী বা পরিবারের সদস্যরা ধূমপান করেন, তাহলে সন্তান-সন্ততির ধূমপান শুরু করার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। এই কাজটি সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানেরও অংশ হয়ে উঠতে পারে। 

পরিবার এবং পারিবারিক কারণ

যেসব পরিবারে বাবা-মা বা ভাইবোন ধূমপান করেন, সেখানে বেড়ে ওঠা শিশু বা কিশোর-কিশোরীদের ধূমপান শুরু করার ঝুঁকি বেশি থাকে।এটি একটি শক্তিশালী পটভূমি তৈরি করে। তবে সব ক্ষেত্রে এটা নাও হতে পারে। যেমন ধরুন, আমার বাবা, ঠাকুরমা ধূমপান করতেন। কিন্তু আমরা ভাই বোনেরা কেউ ধূমপান করি না।

সংস্কৃতিক, আর্থ-সামাজিক এবং বিপণন কারণ

সকল গোষ্ঠীর মধ্যে ধূমপান সমানভাবে দেখা যায় না। আর্থ-সামাজিকভাবে সুবিধাবঞ্চিত, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাযুক্ত, অথবা নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে বসবাসকারী ব্যক্তিরা বেশি ধূমপান করতে পারে।

মানুষ যখন অর্থ উপার্জনের জন্য দেশান্তরিত হয় হয় তখন নিজেকে ভুলিয়ে রাখার জন্য কারো কারো ক্ষেত্রে নেশা করার প্রবনতা বৃদ্ধি পায়। যেমন ভারত, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ থেকে লোকজন সংযুক্ত আরব আমিরাতে (UAE) কাজ করতে গিয়ে শতকরা ২১ ভাগ ভারতীয়, ১২ ভাগ পাকিস্তানি ও ৩৭ ভাগ বাংলাদেশি ধূমপান করছে।

এ ছাড়া বিড়ি-সিগারেট প্রস্তুকারি কোম্পানির বাজার ব্যবস্থাপনা ধূমপানকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। এক গবেষণায় দেখা গেছে যে, সিগারেট প্রস্তুতকারি শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলি উন্নয়নশীল দেশগুলিতে তাদের বাজার সরিয়ে নিচ্ছে। তারা তরুণদেরকে টার্গেট করছে, বিশেষ করে মেয়েদের। এক্ষেত্রে প্রাথমিক প্রসার কম হলেও বাজার প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা বেশি।

প্রথম ধূমপান এবং নিয়মিত হওয়া

প্রথম সিগারেট থেকে নিয়মিত ধূমপানে রূপান্তর এমন একটি প্রক্রিয়া যার মধ্যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং সাপ্তাহিক ব্যবহারের মতো পর্যায় অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। এটি প্রায়শই সামাজিক কারণ, ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্য এবং নিকোটিনের তাৎক্ষণিক প্রভাব দ্বারা প্রভাবিত হয়।

কৌতূহল, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং অল্প বয়সে শুরু

অনেকে কিশোর বয়সে ধূমপান শুরু করে। তারা ধূমপানের ঝুঁকি সম্পর্কে কম জানে বলে হয়তো এমনটা করে। তদুপরি রয়েছে খেলার সাথী, সহপাঠি ও সহকর্মীদের প্রভাব। প্রায়শই প্রথম সিগারেট খাওয়া কৌতূহলবশত শুরু হয়, সহকর্মীদের প্রভাব ও তাদের সাথে মানিয়ে নেওয়ার ইচ্ছা বা বয়স্কভাব দেখানোর জন্যও তা হতে পারে।

আসক্তিতে রূপান্তর

নিকোটিনের প্রভাব, অভ্যাসে পরিনত হওয়া, ইঙ্গিত এবং সামাজিক কারণে মাঝে মাঝে ধূমপান শুরু করা থেকে দৈনন্দিন ধূমপানে রূপান্তরিত হতে পারে। মস্তিষ্ক একবার অভিযোজিত হয়ে গেলে ধূমপান চালু রাখা ছাড়া গতি নেই। 

নানা রকমের বিধি-নিষেধ সত্বেও ধূমপান কমছে না কেন?

তামাক ব্যবহার কমাতে এবং জনস্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য বর্ধিত কর এবং ধূমপানের বিধিনিষেধকে সবচেয়ে কার্যকর নীতিগত পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তুবও ধূমপান আশানুরূভাবে কমছে না, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশেগুলোতে।

অধিক হারে করারোপ এবং বিধিনিষেধ সবসময় ধূমপান বন্ধ করতে পারে না

উচ্চ করারোপ, বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ করা, ধূমপানমুক্ত অঞ্চল ঘোষণা, সতর্কতামূলক লেবেল লাগানো, ইত্যাদি ধূমপানের হার কমাতে সাহায্য করে। তবে যদি অন্তর্নিহিত কারণগুলি (আসক্তি, রুটিন, সামাজিক প্রভাব, চাপ) শক্তিশালী থাকে, তবে ধূমপান ত্যাগ করা খুব কঠিন।

আসক্তি এবং অভ্যাসের দাসত্ব

নিকোটিন আসক্তি এবং অভ্যাস তীব্র হওয়ায় অনেক ধূমপায়ী বারবার ধূমপান ত্যাগ করার জন্য লড়াই করে। তরে তারা প্রায়শই পুনরায় ধূমপান শুরু করে। বাহ্যিক চাপ সত্বেও অভ্যন্তরীণ চালিকাশক্তি (জৈবিক + মনস্তাত্ত্বিক + সামাজিক) জয়ী হয়।

আরেকটি বিষয় হলো সার্কভুক্ত দেশের লোকজন ধোঁয়াবিহীন ধূমপানে অভ্যস্ত হচ্ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে বসবাসকারি ৬% ভারতীয়, ১২% পাকিস্তানী, এবং ১৬% বাংলাদেশি ধোঁয়াবিহীন ধূমপানে অভস্ত হয়েছে। আমার এক স্কুল বন্ধু যার বয়স ৬৫+ সে এখন এমন ধরনের ধূমপান করছে। যুক্তি দেখাচ্ছে যে, এতে নাকি নিকোটিনের পরিমাণ কম!

অসম প্রবেশাধিকার এবং বৈষম্য

সুবিধাবঞ্চিত সম্প্রদায়ের মানুষ নানরকমের চাপে থাকে। তদুপরি তাদেরকে কার্যকরভাবে ধূমপান ত্যাগে সহায়তা করার সুযোগ কম থাকতে পারে এবং ধূমপান সংস্কৃতি দ্বারা বেষ্টিত থাকতে পারে।

ধূমপানের চালিকা শক্তির মিথস্ক্রিয়া: কীভাবে সবকিছু একসাথে আবদ্ধ হয়

ধূমপানের চালিকা শক্তিগুলি (জৈবিক, মনস্তাত্ত্বিক, সামাজিক বা পরিবেশগত) একটি জটিল, সমন্বয়মূলক পদ্ধতিতে মিথস্ক্রিয়া করে। তাদের সম্মিলিত প্রভাব পৃথক প্রভাবের যোগফলের চেয়ে বেশি। এই মিথস্ক্রিয়াগুলি ধূমপান শুরু, ধরে রাখ এবং ত্যাগের প্রচেষ্টাকে প্রভাবিত করে।

ধূমপান-প্রেরণার একটি স্তরযুক্ত মডেল

মানুষ কেন ধূমপান করে তা বোঝার জন্য একাধিক স্তর সম্পর্কে ধারনা থাকা বাঞ্চনীয়:

  • জৈবিক স্তর: নিকোটিন আসক্তি, প্রত্যাহার, মস্তিষ্কের রসায়ন
  • মানসিক স্তর: চাপ উপশম, অভ্যাস, পরিচয়, মেজাজ নিয়ন্ত্রণ
  • সামাজিক স্তর: সমবয়সী গোষ্ঠী, পরিবার, সংস্কৃতি, আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট
  • পরিবেশগত স্তর: বিপণন, রুটিন ইঙ্গিত, সিগারেটের প্রাপ্যতা
  • নীতি স্তর: কর, বিধিনিষেধ, সহায়তা ত্যাগ

এই স্তরগুলি একে অপরের জন্য শক্তি যোগায়। উদাহরণস্বরূপ, সামাজিক রুটিন মানসিক আকাঙ্ক্ষাকে উদ্ভোদ্ধ করে যা জৈবিক চাহিদাকে জাগিয়ে তুলে। অতপর পরিবেশ দ্বারা তা শক্তিশালী হয়।

আচরণ পরিবর্তন করা কেন কঠিন?

কারণ বিভিন্ন ধরনের চালিকা শক্তি বিভিন্ন স্তরে কাজ করে। কেবল সিগারেট নিষিদ্ধ করা বা কর বৃদ্ধি করলেই সমস্ত শক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাটিয়ে ওঠা যায় না। নিকোটিন (জৈবিক) এবং এর সাথে জড়িত অভ্যাস (মানসিক) এবং সামাজিক রুটিন (সামাজিক/পরিবেশগত) এর আসক্তি মানে ধূমপান ত্যাগ করা একটি জটিল পরিবর্তন প্রক্রিয়া।

কেন কেউ কেউ ধূমপান ত্যাগ করতে পারে, অন্যেরা পারে না কেন?

কিছু কিছু ধূমপায়ী ধূমপান ত্যাগ করতে সক্ষম হন, কারণ তারা একাধিক স্তরের সাথে মোকাবিলা করেন- তারা নিকোটিন প্রত্যাহারের জন্য জৈবিক চাহিদা মোকাবিলা করার কৌশল খুঁজে পান। 

তারা রুটিন এবং সামাজিক বৃত্ত পরিবর্তন করেন এবং সম্ভবত কাউন্সেলিং এর মতো নীতিগত সহায়তা থেকে উপকৃত হন। অনেকেই ব্যর্থ হন, কারণ তারা এক বা একাধিক স্তরের সমাধান করা করতে পারেননি।

সার্কভুক্ত দেশসমূহে কোন দেশের লোকজন বেশি ধূমপান করে

দক্ষিণ এশিয়ার তিনটি দেশ- বাংলাদেশ, ভারত এবং পাকিস্তানের সাথে তুলনা করে গবেষকরা দেখেছেন যে, সামগ্রিকভাবে ধূমপান ও ধোঁয়াবিহীন ধূমপান খুব বেশি। বাংলাদেশে এর পরিমাণ প্রায় ৪৩.৩%, ভারতে ৩৪.৬% এবং পাকিস্তানে ১৯.১%। 

আরেকটি সমীক্ষা থেকেও দেখা যায় যে, বাংলাদেশের লোকজন সবচেয়ে বেশি ধূমপান করে (৩০.৮%) এবং সবচেয়ে কম ধূমপায়ি হলো পাকিস্তানে (১৭.২%) (চিত্র নং-২)।

চিত্র নং- ২: সার্কভুক্ত দেশগুলিতে ধূমপানের হার

 

কী ধরনের প্ররোচনা ধূমপানের জন্য দায়ী?

নানা রকমের প্ররোচনা সার্কভুক্ত অঞ্চলে ধূমপান বৃদ্ধির কারণ। যথা-

প্রাথমিক দীক্ষা এবং যৌবনের আত্মপ্রকাশ

একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, বাংলাদেশ, ভারত এবং পাকিস্তানে ১৫ বছর বয়সের আগে তামাক ব্যবহার (বিশেষ করে ধোঁয়াবিহীন) করার প্রবণতা সময়ের সাথে সাথে বৃদ্ধি পেয়েছে। 

আর্থ-সামাজিক এবং শিক্ষাগত যোগ্যতা

কম শিক্ষিত এবং কম সম্পদের অধিকারী ব্যক্তিদের ধূমপানের প্রবণতা বেশি। নিজেকে ভুলিয়ে রাখার জন্য এবং পারিবরিক করণে এমন ঘটে থাকে বলে বিবেচনা করা হয়। 

ধোঁয়াবিহীন তামাকের রূপান্তর এবং পণ্য প্রতিস্থাপন

দক্ষিণ এশিয়াযর কিছু জায়গায় তামাকের ব্যবহার কমে গেলেও ধোঁয়াবিহীন তামাকের ব্যবহার বেড়েছে। বাংলাদেশ, ভারত এবং নেপালে করা একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে ধূমপানের প্রবণতা হ্রাস পেয়েছে (বাংলাদেশে ~৬%, ভারত ~৩%, নেপাল ~৭%), তবে ধোঁয়াবিহীন ধূমপান (SLT) বৃদ্ধি পেয়েছে (বাংলাদেশ +৩%, ভারত +৬%, নেপাল +৪%)।

সহপাঠী এবং সামাজিক প্রভাব, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান

বাংলাদেশের সিলেট বিভাগের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উপর করা এক গবেষণায় দেখা গেছে যে, ৩৭% ছাত্র-ছাত্রীদের ধূমপানের প্রবণতা রয়েছে। প্রায় অর্ধেক পুরুষ ছাত্র ধূমপায়ী।

সাংস্কৃতিক ও পণ্য-বিপণন পরিবেশ

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলিতে তামাক কোম্পানিগুলির বিপণন এবং আগ্রাসী পণ্যের প্রাপ্যতা এখনও উদ্বেগের বিষয়। উদাহরণস্বরূপ, SLT বিপণনের কৌশল উচ্চ ব্যবহারের সাথে যুক্ত।

নীতি ও অনুশীলনের জন্য প্রভাব

দক্ষিণ এশিয়ায় হস্তক্ষেপগুলিকে কেবল সিগারেট নয়, ধূমপান এবং ধোঁয়াবিহীন তামাক উভয়কেই মোকাবেলা করতে হবে। যুবকদেরকে ধূমপান থেকে বিরত রাখতে পারা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর ফলে সাফল্য তাড়াতাড়ি আসে।

আর্থ-সামাজিক বৈষশ্য মোকাবেলা

নিম্ন-আয়ের গোষ্ঠীর জন্য ব্যবস্থা নেয়া গুরুত্বপূর্ণ। তারা যাতে ধূমপান ছাড়তে পারে সে বিষয়ে সাহায্য ও সহযোগীতা করতে হবে, সামাজিক বৈশষ্য কমাতে হবে।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভিত্তিক কৌশল

শিক্ষার্থী/বিশ্ববিদ্যালয় পরিবেশে সহকর্মী-ভিত্তিক কৌশল (মান পরিবর্তন, সহকর্মী ধূমপান হ্রাস) মূল্যবান হতে পারে।

বাণিজ্যিক কৌশলে হস্তক্ষেপ

পরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে SLT পণ্য এবং বিপণনের পর্যবেক্ষণ এবং নিয়ন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ।

 

প্রশ্নোত্তর

কেন একজন ধূমপায়ী মনে করেন যে, ধূমপান তাদের শিথিল করতে সাহায্য করে?

ধূমপানে বিরতির ফলে যে লক্ষণগুলি দেখা দেয় তা চরে যায় ধূমপানের পর- এক ধরনের অস্থায়ী স্বস্তি, যাকে তারা শিথিলতার মতো অনুভব করে।

সামাজিক পরিবেশ ধূমপানের প্রতি কীভাবে প্রভাব ফেলে?

যদি পরিবার, বন্ধুবান্ধব বা সহকর্মীরা ধূমপান করে, তাহলে অন্যেরা ধূমপানের চেষ্টা করলে তাকে স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ করে।

কোন গোষ্ঠীর ধূমপান বেশি এবং কেন তাদের ধূমপান ত্যাগ করা কঠিন?

মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগা, অথবা ধূমপান সাধারণ পরিবেশে বসবাসকারী, আর্থ-সামাজিকভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষ।

নিকোটিন বারবার ব্যবহার করলে মস্তিষ্কে কী ঘটে?

ডোপামিন নিঃসৃত হয়, পুরষ্কারের বর্তনী সক্রিয় হয়, সময়ের সাথে সাথে রিসেপ্টর বৃদ্ধি পায়, সহনশীলতা তৈরি হয় এবং নির্ভরতা বিকশিত হয়।

ধূমপান ত্যাগ করা কেন একটি বহু-স্তরীয় চ্যালেঞ্জ?

কারণ এতে জীববিজ্ঞান (আসক্তি), মনোবিজ্ঞান (অভ্যাস, মোকাবেলা), সামাজিক পরিবেশ (সহকর্মী/পরিবার), এবং রুটিন/পরিবেশ (ট্রিগার) একসাথে জড়িত।

এমন কি করা যায় যা একজন ধূমপায়ীকে সফলভাবে ধূমপান ত্যাগ করতে সাহায্য করতে পারে?

নিকোটিন-প্রতিস্থাপন থেরাপি বা অন্যান্য চিকিৎসা সহায়ক (জৈবিক), কাউন্সেলিং বা আচরণগত থেরাপি (মানসিক), সামাজিক রুটিন বা সমবয়সীদের গোষ্ঠী পরিবর্তন (সামাজিক), ধূমপান ত্যাগের মতো সহায়ক নীতি বা ধূমপানমুক্ত স্থান (নীতি/পরিবেশ)।

 

উপসংহার

বিশ্বব্যাপী ধূমপান টিকে থাকার কারণ এই নয় যে, মানুষ ঝুঁকি সম্পর্কে অজ্ঞ। বরং জটিল কারণগুলির একটি জাল আচরণকে চলমান রাখে। নিকোটিনের আসক্তি থেকে শুরু করে রুটিনের আরামদায়ক অবস্থা আঁকড়ে ধরা, সমবয়সীদের চাপ থেকে শুরু করে মানসিক চাপের কারণে ধূমপান চলমান থাকে। 

সরকারের নীতি, বিশেষ করে করারোপ, নিষেধাজ্ঞা ও সতর্কতা ধূমপান কমাতে গুরুত্বপূর্ণভাবে সাহায্য করে। তবে এ পদ্ধতি ধূমপানের গভীর কারণগুলি উন্মোচন করতে পারে না। 

ধূমপান কার্যকরভাবে কমাতে হলে জৈবিক, মানসিক, সামাজিক এবং পরিবেশগত শক্তিগুলিকে কীভাবে নিয়ন্ত্রন করা যায় তা বিবেচনায় নিতে হবে এবং বহু-স্তরীয় সাহায্যের মাধ্যমে ধূমপায়ীদের সমর্থন করতে হবে।