অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী অনুজীবের উত্থান ও GenAI এর ভূমিকা

Category: Health & Wellness | Tags: No tags

Author: Jatish Chandra Biswas | Published on: November 4, 2025, 7:44 p.m.


এক সময় বেড়ে চলছিল মৃত্যর মিছিল। তারপর উদ্ভাবন হলো এক অলৌকিক চিকিৎসা ব্যবস্থা- অ্যান্টিবায়োটিকের আবিষ্কার। বিংশ শতাব্দীতে মানুষের মৃত্যুর হারকে থামিয়ে দিল অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার।

তবে আজ আমরা এক ভয়াবহ বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছি। এক সময়ের বিশ্বস্ত অ্যন্টিবকায়োটিক আগের মতো আর ব্যাকটেরিয়াকে দমন করতে পারছে না। নানান রকমের কারণ এর সাথে জড়িত রয়েছে।

অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী অনুজীবের (AMR) উত্থান বিশ্বব্যাপি দেখা দিলেও উন্নয়নশীল দেশগুলিতে তা প্রকট আকর ধারন করেছে। এর মূল কারণ হলো প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী ওষুধ না খাওয়া, ওষুধের অপব্যবহার এবং স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার অপ্রতুলতা।

তবে গল্পটি এখানেই শেষ নয়। GenAI এর অগ্রগতি আমাদের জন্য আশীর্বাদ বয়ে আনছে। গবেষকরা অ্যামিনো অ্যাসিডের সংক্ষিপ্ত শৃঙ্খল ব্যবহার করে সম্পূর্ণ নতুন অ্যান্টিবায়োটিক যৌগ ডিজাইন করছেন এবং ভবিষ্যতের জন্য আশা জাগিয়ে তুলছেন।

এই প্রবন্ধে আমি আলোচনা করবো কিভাবে AMR এর উদ্ভব হয়েছে, কেন এর সমাধান এতো কঠিন এবং কীভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) দ্বারা তৈরি পরবর্তী প্রজন্মের অ্যান্টিবায়োটিকগুলি মানবতার সেবা করতে পারে।

অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ কী এবং কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?

অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ হলো এমন একটি অবস্থা যখন অণুজীবগুলি অ্যান্টিবায়োটিকের ক্ষমতাকে নস্যাৎ করে বেঁচে থাকে এবং সংক্রমণ বৃদ্ধি করে। ফলে রোগ নিরাময় করা কঠিন হয় এবং বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়ায়।

অনুজীব শত্রুর সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে

অনুজীব এতটাই পরিবর্তিত হয় যে, তাদের মারার জন্য তৈরি ওষুধগুলি আর কাজ করে না। অ্যন্টিবায়োটিককে বৃদ্ধঙ্গুলি দেখিয়ে টিকে থাকে, সংখ্যায় বৃদ্ধি পায় এবং ছড়িয়ে পড়তে থাকে। ফলে মৃত্য অবধারিত। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন অনুসারে ৯৩ ধরণের সংক্রমণের ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করছে না। এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি মারাত্মক হুমকি। উদাহরনস্বরূপ, ২০১৯ সালে ব্যাকটেরিয়াজনিত AMR-এর সাথে প্রায় ৫০ লক্ষ মানুষের মৃত্যু জড়িত ছিল। 

অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের প্রক্রিয়া

অণুজীব অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী হওয়ার জন্য বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করতে পারে (চিত্র নং ১)। এই কৌশলগুলির মধ্যে রয়েছে: 

  • ফার্মাকোলজিকাল লক্ষ্যবস্তুর পরিবর্তন করা,  
  • পোরিনের মাত্রা, কার্যকারিতা বা নির্বাচন পরিবর্তনের কারণে ঝিল্লির ভেদ্যতায় পরিবর্তন,
  • অনুজীবের কোষ থেকে অ্যান্টিবায়োটিকের সক্রিয় নিষ্কাশন,
  • হাইড্রোলাইসিস, কার্যকরী গ্রুপ স্থানান্তর বা রেডক্স প্রক্রিয়ায় জড়িত এনজাইমগুলির নিষ্ক্রিয়তা, 
  • বায়োফিল্ম গঠন যা হোস্টকে ইমিউনোলজিক্যাল প্রক্রিয়া বিকাশে বাধা দেয়, এবং 
  • প্রতিরোধী জিনের অধিগ্রহণ।

চিত্র নং- ১: ব্যাকটেরিয়ার অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী হওয়ার পদ্ধতি 

 

AMR সংক্রমণ এবং অর্জন মূলত স্বাস্থ্যসেবা সুবিধার ভিতরে এবং বাইরে উভয় ক্ষেত্রেই মানুষের ক্রিয়াকলাপের মাধ্যমে ঘটে। স্বাস্থ্যসেবা এবং কৃষির সাথে সম্পর্কিত বিপুল সংখ্যক পরস্পর নির্ভরশীল কারণ ওষুধ-প্রতিরোধী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে AMR এর বিকাশকে নিয়ন্ত্রণ করে।

গবাদি পশুর খাদ্যে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়ালের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার থেকে AMR এর উত্থান এবং বিস্তার একটি প্রধান কারণ। ফলে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার প্রাদুর্ভাব বিশ্বব্যাপী একটি মারাত্মক স্তরে পৌঁছেছে। 

উন্নয়নশীল দেশগুলি কেন বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ?

অনেক নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে চ্যালেঞ্জ দ্বিগুণ। কারণ সংক্রমণ খুবই একটা সাধারণ বিষয় এবং ওষুধগুলি ভুলভাবে ব্যবহার করা হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, রোগীরা অনেক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়ের আগেই অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া বন্ধ করে দেয়

উন্নয়নশীল দেশের রোগীরা প্রেসক্রিপশন ছাড়াই ওষুধ কিনতে পারে অথবা ভাইরাল সংক্রমণের ক্ষেত্রে অ্যন্টিবায়োটিক ব্যবহার করতে পারে যা কাজে লাগে না। বরং অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার ব্যাকটেরিয়ার প্রতিরোধ গড়ে তোলার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয় অ্যান্টিবায়োটিকের অনুপযুক্ত প্রেসক্রিপশন এবং ক্লিনিকাল এবং নন-ক্লিনিকাল উভয় ক্ষেত্রেই তাদের অত্যধিক ব্যবহার এই সমস্যাটিকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। ফলে মৃত্যুর হার বৃদ্ধি পেয়েছে এবং স্বাস্থ্যসেবা ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে।

তবে প্রতিরোধী সংক্রমণ কেবল মানুষের স্বাস্থ্যকেই নয়, অপচিকিৎসিত গবাদি পশুর রোগের মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা এবং জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

কেন আমাদের অ্যান্টিবায়োটিকের সক্ষমতা ফুরিয়ে আসছে?

অতিরিক্ত ব্যবহার, অপব্যবহার এবং ব্যাকটেরিয়ার প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির কারণে  কার্যকরি অ্যান্টিবায়োটিকের সংখ্যা কমে আসছে। ফলে বিশ্বব্যাপী সংক্রমণের চিকিৎসার জন্য কার্যকর বিকল্পগুলি কম।

ক্রমহ্রাসমান পাইপলাইন

জরুরি সত্ত্বেও নতুন অ্যান্টিবায়োটিকের বিকাশ ধীর গতিতে চলছে। অনেক ওষুধ কোম্পানি অ্যান্টিবায়োটিকের বিকাশকে লাভজনক বলে মনে করে না। অর্থাৎ কম লাভের মার্জিন, উচ্চ নিয়ন্ত্রক বোঝা। ফলে কম সংখ্যক নতুন ওষুধ বাজারে আসছে। 

অ্যান্টিবায়োটিক তৈরিতে প্রাথমিক খরচ অধিক

অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কারের প্রাথমিক খরচ অনেক বেশি। তবে যদি সঠিক পদক্ষেপ না নেয়া হয় তবে ২০৫০ সালের মধ্যে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল প্রতিরোধের ফলে বছরে ১ কোটি বা তার বেশি মানুষের মৃত্যু হতে পারে এবং হাজার হাজার বিলিয়ন ডলারের আর্থিক ক্ষতি হতে পারে। 

ব্যাকটেরিয়া দ্রুত শিখতে পারে

যখনই কোনও নতুন অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়, তখনই ব্যাকটেরিয়া নির্বাচনী চাপের সম্মুখীন হয়। যাদের মিউটেশন বা প্রতিরোধী জিন রয়েছে তারা বেঁচে যায় এবং বংশবিস্তার করে। 

অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার ও অপব্যবহার প্রতিরোধ তৈরির প্রক্রিয়াটিকে ত্বরান্বিত করে। ফলাফল: নতুন ওষুধ এবং ব্যাকটেরিয়ার প্রতিরোধের মধ্যে "অস্ত্র প্রতিযোগিতা" ক্রমশ একতরফা হয়ে উঠছে। 

সবচেয়ে মারাত্মক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়াগুলির মধ্যে রয়েছে Escherichia coli, Staphylococcus aureus, Klebsiella pneumoniae, Streptococcus pneumoniae, Acinetobacter baumannii, এবং Pseudomonas aeruginosaClostridioides difficile, MRSA এবং ওষুধ-প্রতিরোধী Neisseria gonorrhoeae এর মতো সুপারবাগগুলি উল্লেখযোগ্য প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। ফলে স্ট্যান্ডার্ড চিকিৎসা অকার্যকর হয়ে পড়েছে।

বিশ্বব্যাপী আন্তঃসংযোগ

বিশ্বব্যাপী ভ্রমণ, বাণিজ্য এবং অভিবাসন অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া দ্রুত সীমান্ত পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে। রোগ নির্ণয়ের অভাব, দুর্বল সংক্রমণ-নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি এবং অপ্রতুল স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা এ ধরনের বিস্তারকে আরো বাড়িয়ে তুলতে পারে, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলিতে। 

অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কারে অবিনবত্ব: পেপটাইড, এআই এবং আরো মনিমানিক্য

অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কারের জন্য যে সকল উদ্ভাবন গুরুত্ব পাচ্ছে তা হলো পেপটাইড, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পরিচালিত ওষুধের বিকাশ এবং নতুন প্রযুক্তি প্রতিরোধী সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে কার্যকারিভাবে লড়াইয়ের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে।

অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল পেপটাইড (AMPs): প্রকৃতির নিজস্ব অস্ত্র

অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল পেপটাইড (AMPs) হল অ্যামিনো অ্যাসিডের সংক্ষিপ্ত শৃঙ্খল যা অনেক জীব, যথা- উদ্ভিদ, প্রাণী ও জীবাণু থেকে উৎপাদিত হয়। এগুলো রোগজীবাণুর বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষার প্রথম সারির ভূমিকা পালন করে। 

পেপটাইডগুলো ব্যাকটেরিয়ার ঝিল্লি/মেমব্রেন নষ্ট করে, ব্যাকটেরিয়া আটকে রাখে বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করে। গবেষকরা AMPs কে প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিকের প্রতিশ্রুতিশীল বিকল্প বা পরিপূরক হিসেবে দেখেন। তবে AMPs তাদের নিজস্ব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়- উৎপাদন খরচ, মানবদেহে স্থিতিশীলতা এবং বিষাক্ততার সম্ভাবনা। এই সবকিছুর সমাধান করতে হবে। 

অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল পেপটাইডের শ্রেণীবিভাগ 

বিভিন্ন উৎস হতে পেপটাইড পাওয়া যায় এবং তাদের গঠন ও কার্যক্রমের উপর ভিত্তি করে তাদেরকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা হয় (চিত্র নং- ২)। যেমন- ক্যান্সার প্রতিরোধী, ভাইরাল প্রতিরোধী, ইত্যাদি।

চিত্র নং- ২: অ্যমিনো পেপটাইডেরেউৎস ও শেণী বিভাগ 

 

জেনারেটিভ এআই: নতুন অ্যান্টিবায়োটিক ডিজাইনে অগ্রতি

সাম্প্রতিক বছরগুলিতে GenAI ওষুধ এবং পেপটাইড ডিজাইনে প্রয়োগ করা শুরু হয়েছে। একটি যুগান্তকারী উন্নতি হলো Cesar de la Fuente‑Nuñez ল্যাব এবং তার সহকর্মীরা GenAI মডেল ব্যবহার করে ৫০,০০০টি নতুন পেপটাইড ডিজাইন করেছেন যা অনুজীব ধ্বংস করতে পারবে বলে মনে করা হচ্ছে। 

GenAI কীভাবে কাজ করে?

GenAI মডেলটিকে পরিচিত পেপটাইড সিকোয়েন্স এবং তাদের কার্যকলাপের উপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তারপর জেনারেটিভ অ্যালগরিদম ব্যবহার করে একটি নতুন সিকোয়েন্স সম্পন্ন পেপটাইড বানায় যার অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে। 

এমন সক্ষমতাসম্পন্ন নতুন যৌগ আবিষ্কারকে ত্বরান্বিত করছে যা গতানুগতিকভাবে করতে গেলে বছরের পর বছর সময় ব্যয় করতে হতো। এখন ৭ দিন বা এক দিনেও তৈরি করা যাচ্ছে।

কেস স্টাডি: DLFea4AMPGen এবং AMP-Diffusion

অতি সাম্প্রতি এক গবেষণায় DLFea4AMPGen ব্যবহার করে মুখ্য অ্যামিনো-অ্যাসিডের বৈশিষ্ট্যগুলি সনাক্ত এবং তা নতুনভাবে সাজিয়ে জৈবিভাবে সক্রিয় পেপটাইড ডিজাইন করা হয়েছে। 

নির্বাচিত ১৬টি প্রতিনিধি পেপটাইড নিয়ে ল্যাবের গবেষণায় দেখা গেছে যে, তাদের  মধ্যে ১২টি (৭৫%) কমপক্ষে দুই ধরণের কাজ সম্পাদন করতে পারে- অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল, অ্যান্টিফাঙ্গাল ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। এই ফলাফলগুলি ইঙ্গিত দেয় যে, আমরা অ্যান্টিবায়োটিক তৈরির এক নতুন যুগে প্রবেশ করছি।

নব নব আবিষ্কার আমাদের জন্য কী বার্তা দেয়?

প্রতিটি নতুন আবিষ্কার আমাদের কষ্ট লাগব করে অথবা জীবন চলার পথকেকে মসৃণ করে। চলুন দেখি নতুন আবিষ্কার আমাদের জন্য কি করতে পারে-

দুৎসাধ্য সংক্রমণ নিরাময়ে জন্য আশার আলো

দক্ষিণ এশিয়ায় অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার একটি সাধারণ ঘটনা। ফলে এখানে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী সংক্রমণ ব্যাপক। কাজেই নতুন চিকিৎসার পাইপলাইন একটি জীবনকে বাঁচিয়ে রাখতে ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়। 

ডিজাইন করা পেপটাইডগুলি ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সৃষ্ট সংক্রমণের জন্য নতুন থেরাপি প্রদান করতে পারে, যা বর্তমানে ব্যবহৃত ওষুধের প্রতি সাড়া দেয় না। তাদের ব্যবহার অসুস্থতা, মৃত্যুহার এবং স্বাস্থ্যসেবার মাণ বাড়াতে পারে।

কৃষি ও পশুপালনের ক্ষেত্রে প্রয়োগ

উন্নয়নশীল দেশগুলিতে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ ক্ষমতা কেবল মানুষের স্বাস্থ্যের সমস্যাই নয়; বরং এটি প্রাণী, মাছ এবং ফসলের উপরও প্রভাব ফেলে। উদাহরণস্বরূপ, পশুখাদ্যে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার জন্ম দেয়, যা মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে। 

ঐতিহ্যবাহী অ্যান্টিবায়োটিকের উপর নির্ভরতা কমাতে পশুচিকিৎসা বা কৃষিক্ষেত্রে নতুন অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল পেপটাইড সাবধানতার সাথে ব্যবহার করা যেতে পারে। ফলে প্রতিরোধ ক্ষমতার বিকাশ ধীর হয়ে যাবে।

ন্যায়সঙ্গত প্রবেশাধিকার এখনও একটি চ্যালেঞ্জ

যদি নতুন চিকিৎসা ব্যবস্থা সহজলভ্য না হয়, তাহলে তা খুব একটা লাভজনক হবে না। উন্নয়নশীল দেশগুলিকে অবশ্যই নিয়ন্ত্রক কাঠামো, সরবরাহ-শৃঙ্খল এবং মূল্য নির্ধারণ নীতিমালা নিশ্চিত করতে হবে।

শুধু রাজধানী বা বড় বড় শহরেই নয় গ্রামীণ এলাকায়ও ওষুধের ব্যাপক প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জোর দিয়ে বলেছে যে, নজরদারি, তত্ত্বাবধান এবং রোগ নির্ণয় নতুন ওষুধের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। 

অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল পেপটাইড ব্যবহারে চ্যালেঞ্জ এবং বাধা

চ্যালেঞ্জগুলির মধ্যে রয়েছে প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি, নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগ, নিয়ন্ত্রক বাধা এবং কার্যকারিতা অপ্টিমাইজ করা। স্বাস্থ্যসেবায় GenAI দ্বারা বানানো অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল পেপটাইডের সফল সমন্বয়করণের জন্য এই বাধাগুলি মোকাবেলা করা অপরিহার্য।

নিরাপত্তা, ডেলিভারি এবং খরচ

শক্তিশালী AI-ডিজাইন করা পেপটাইড থাকা সত্ত্বেও ক্লিনিকে পৌঁছানো মামুলি ব্যপার নয়। উৎপাদিত যৌগগুলি মানুষ বা প্রাণীর জন্য নিরাপদ হতে হবে, শরীরে স্থিতিশীল থাকতে হবে এবং সংক্রমণের স্থানে পৌঁছাতে সক্ষম হতে হবে। বাণ্যিজ্যিকভাবে এবং সাশ্রয়ী মূল্যে তৈরি করা আরেকটি বড় বাধা। 

নতুন এজেন্টের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের উত্থান

দুঃখের বিষয় হলো ব্যাকটেরিয়া নতুন যৌগকেও প্রতিরোধ করতে পারে। কিছু AMP এর ক্ষেত্রে ইতিমধ্যেই প্রতিরোধ বিকাশের প্রাথমিক লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। সুতরাং নতুন অ্যান্টিবায়োটিক চূড়ান্ত সমাধান নয়- এগুলিকে অবশ্যই তত্ত্বাবধান এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের একটি বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে বিবেচনা হবে।

নিয়ন্ত্রক, অর্থনৈতিক ও নীতিগত সীমাবদ্ধতা

অ্যান্টিবায়োটিক এবং বিকল্প এজেন্ট তৈরি করা ব্যয়বহুল এবং ঝুঁকিপূর্ণ। সরকার, জনস্বাস্থ্য সংস্থা এবং ওষুধ কোম্পানিগুলিকে অবশ্যই প্রণোদনা সামঞ্জস্য করতে হবে; বিশেষ করে নিম্ন-আয়ের দেশগুলির বাজারের জন্য, যেখানে বিনিয়োগের উপর রিটার্ন কম হতে পারে। এগুলো বিবেচনায় না নিলে উদ্ভাবন স্থবির হয়ে যেতে পারে। 

সময়ের বিরুদ্ধে দৌড়ে জয়লাভ করতে হবে

গবেষকরা নতুন এজেন্ট ডিজাইন করার সময় প্রতিরোধী সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে থাকে। নজরদারি, রোগ নির্ণয়, স্বাস্থ্যবিধি, যুক্তিসঙ্গত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার এবং বিশ্বব্যাপী সহযোগিতাকে বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হবে, বা ঝুঁকি অতিক্রম করতে হবে।

কীভাবে AMR এর মোকাবিলা করবো আমরা?

AMR মোকাবেলার জন্য একটি বহুমুখী এবং সমন্বিত পদ্ধতির প্রয়োজন। এটি ব্যক্তি পর্যায় থেকে শুরু করে সামষ্টিক পর্যায়ে কীভাবে কাজ করে তা জানতে হবে। যেমন- AMR নজরদারি, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল স্টেউয়ার্ডশিপ, সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিরাময় ব্যবস্থার উন্নয়ন  এবং  বিশ্বব্যাপী শক্তিশালী নীতি কৌশল অবলম্বন ও তহবিল সরবরাহ থেকে শুরু করে অভিনব অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল থেরাপিউটিক কৌশলগুলির বিকাশ করতে হবে।

ভবিষ্যতের নিরাপত্তার এবং সম্মিলিত পদক্ষেপে

একক এবং দলগত প্রচেষ্টা ছাড়া AMR এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ জয় করা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো বিবেচনা করা যেতে পারে-

অভিজ্ঞতা ভাগ করা ও সচেতনতা বৃদ্ধি করা

আপনি যে ক্ষেত্রে কাজ করছেন তা দিয়েই শুরু করতে পারেন। যেমন- কৃষি, পুষ্টি, গ্রামীণ স্বাস্থ্য ইত্যাদিতে অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার কীভাবে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে সে সম্পর্কে জ্ঞান ভাগ করে নেয়া ও সচেতনা বৃদ্ধি করা।

দায়িত্বশীল ব্যবহারকে উৎসাহিত করা

প্রেসক্রিপশন মেনে চলাকে উৎসাহিত করুন, নিজের ইচ্ছামতো ওষুধ গ্রহণকে নিরুৎসাহিত করুন, প্রয়োজনে প্রেসক্রিপশন করার আগে রোগ নির্ণয়ের জন্য পরীক্ষা করার পরামর্শ দিন।

উদ্ভাবনী বাস্তুতন্ত্রকে সমর্থন করা

দক্ষিণ এশিয়া এবং অন্যন্য দেশে থেকে গবেষণা তহবিল পেতে চেষ্ট করুন, শিক্ষাবিদ এবং শিল্পের মালিকদের সাথে অংশীদারত্ব প্রতিষ্ঠায় সর্মথন দিন। সর্বোপরি ওষুধ উন্নয়ন ও উৎপাদনের জন্য স্থানীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির উপর জোর দিন।

নজরদারি এবং তথ্য উন্নত করুন

মানুষ, প্রাণী এবং কৃষিতে প্রতিরোধের তথ্য সংগ্রহ জোরদার করুন। এগুলো স্থানীয় নীতি কৌশল বাস্তবায়নে কাজে লাগবে।

সমন্বিত তত্ত্বাবধান অনুশীলন করুন- অ্যান্টিবায়োটিকের চাহিদা কমাতে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, টিকা নেয়া এবং বিকল্প চিকিৎসার সাথে নতুন এজেন্টগুলিকে একত্রিত করুন।

প্রশ্নোত্তর

জেনারেটিভ এআই দ্বারা তৈরি পেপটাইডের কার্যকারিতা প্রাকৃতিক পেপটাইডের তুলনায় কীভাবে আলাদা বা উন্নত হতে পারে?

AI ডিজাইনকৃত পেপটাইডগুলি নির্দিষ্ট ব্যাকটেরিয়ার জন্য দ্রুত কার্যকর হতে পারে। তদুপরি GenAI স্থিতিস্থাপকতা বাড়াতে বা নতুন গঠন ব্যবহার করে কার্যকারিতা উন্নত করতে সক্ষম।

নতুন পেপটাইড কী ধরনের পরিবেশে সবচেয়ে বেশি কার্যকারিতা দেখায়?

সাধারণত অন্ধকার, উষ্ণ ও আর্দ্র পরিবেশে কার্যকারিতা বেশি দেখা যায়; কারণ এই পরিবেশে ব্যাকটেরিয়া বেশি সক্রিয় থাকে এবং পেপটাইডের অ্যাকটিভিটি প্রভাব ফেলতে পারে।

জেনারেটিভ AI কি অ্যান্টিমাইক্রোব্যাল পেপটাইডের টার্গেটিং প্রক্রিয়ায় কোনও নতুন বৈশিষ্ট্য যোগ করতে পারে?

হ্যাঁ, AI নতুন টার্গেটিং মোড বা মাল্টি-টার্গেটিং ক্ষমতা যোগ করতে পারে; যা একাধিক ব্যাকটেরিয়া প্রজাতির বিরুদ্ধে কার্যকর হতে পারে।

জেনএআই দ্বারা তৈরি পেপটাইড দ্বারা পরিবেশগত দূষণের সম্ভাবনা কতখানি এবং কীভাবে তা কমানো যায়?

AI ডিজাইনকৃত পেপটাইডের দূষণ সম্ভাবনা কম। কারণ এগুলির গঠন নির্দিষ্টভাবে ডিজাইন করা হয়; যা ক্ষতিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা পরিবেশে স্থায়িত্ব সীমিত করে।

জেনারেটিভ এআই দ্বারা তৈরি অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল পেপটাইডের সম্ভাব্য বিকল্প বা প্রতিযোগী প্রযুক্তি কী?

নিউক্লিওটাইড অ্যান্টিবায়োটিকস বা কম্পিউটার-সৃষ্ট ক্ষতিকর রাসায়নিক এজেন্টের বিকল্প হতে পারে। তবে পেপটাইডের ক্ষেত্রে তাদের কার্যকারিতা ও নিরাপত্তার দিক থেকে আলাদা।

কিভাবে এই AI-উদ্ভাবিত পেপটাইডের উৎপাদন প্রক্রিয়াকে দ্রুত ও সাশ্রয়ী করে তোলা যায়?

জেনারেটিভ AI-র মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় ডায়াগ্রামিং ও সিনথেসিস প্রক্রিয়া উন্নত করে উৎপাদন দ্রুত ও কম খরচে করা সম্ভব।

ভবিষ্যতে AI-উদ্ভাবিত পেপটাইডগুলি কীভাবে স্বয়ংক্রিয় পরীক্ষাগারে দ্রুত পরীক্ষা ও অনুমোদনের জন্য সক্ষম হবে?

AI-ভিত্তিক অটোমেটেড পরীক্ষাগার প্রযুক্তি ও ডেটা অ্যানালিটিক্স ব্যবহারে দ্রুত পরীক্ষা ও অনুমোদন প্রক্রিয়া সম্ভব হবে, ট্রায়াল সময় কমাবে।

জেনারেটিভ AI দ্বারা তৈরি পেপটাইডের জন্য কি কোনও নৈতিক বা নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ দেখা দিতে পারে?

হ্যাঁ, অজানা বা অপ্রয়োজনীয় গঠন ডিজাইন বা অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে নিরাপত্তা ঝুঁকি ও নৈতিক সমস্যা দেখা দিতে পারে।

জেনারেটিভ AI প্রযুক্তি কি শুধুমাত্র মানবস্বাস্থ্যের জন্যই নয়, পোষা প্রাণীর বা কৃষি ব্যবস্থার জন্যও কার্যকর হতে পারে?

অবশ্যই, AI ডিজাইনকৃত পেপটাইডগুলি পশু ও উদ্ভিদ রোগের বিরুদ্ধে নতুন প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সহায়ক হতে পারে। ফলে বহুমুখী প্রয়োগ সম্ভব।

ভবিষ্যতে এই AI-উদ্ভাবিত অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল পেপটাইডের সাথে কৃত্রিম ইন্টেলিজেন্সের সংমিশ্রণ কিভাবে আরও নতুন উদ্ভাবনের পথ খুলবে?

AI ও মেশিন লার্নিং আরও উন্নত হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নতুন গঠন ডিজাইন, কার্যকারিতা মূল্যায়ন ও দ্রুত বাজারে আনয়নের সম্ভাবনা বাড়বে। অর্থাৎ অ্যান্টিবায়োটিকের ভবিষ্যতকে রূপান্তর করবে।

উপসংহার

অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ খুব বেশি দূরের ভবিষ্যৎ নয়। এটি এখনই বর্তমান এবং এটি উন্নয়নশীল দেশগুলিতে সংক্রমণের চিকিৎসা, অস্ত্রোপচার, বিশ্বকে খাওয়ানো এবং জনস্বাস্থ্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে আমাদের ক্ষমতাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। তবে গল্পটি পরাজয়ের গল্প হওয়া উচিত নয়।

জেনারেটিভ এআই, পেপটাইড ডিজাইন এবং নতুন অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল কৌশলের অগ্রগতির মাধ্যমে আমরা এমন একটি ভবিষ্যতের আভাস পাচ্ছি যেখানে আমরা প্রতিরোধী রোগজীবাণুগুলিকে চিরকাল তাড়া করার পরিবর্তে তাদের থেকে এগিয়ে যেতে পারি।

বাংলাদেশ এবং দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের মতো দেশগুলির জন্য নতুন অ্যান্টিবায়োটিকের প্রতিশ্রুতি আশার আলো জাগায়। তবে এটি তখনই সম্ভব যখন আমরা উদ্ভাবনের সাথে তত্ত্বাবধান, প্রাপ্যতা, ন্যায়বিচার এবং শক্তিশালী স্বাস্থ্য ব্যবস্থা যুক্ত করতে পারবো।

গবেষক, অনুশীলনকারী, নীতিনির্ধারক, কৃষক এবং নাগরিক সবাইকে সেবার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। আসুন আজই আমাদের প্রচেষ্টা দ্বিগুণ করি, যাতে আগামীকালের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে থাকে।