সময়ের পরিক্রমায় আকাশে নানান রঙের খেলা চলে। কখনো কখনো দিনের আকাশের নীল রঙ খুব একটা নীল মনে হয় না। আবার কখনোবা সূর্যাস্তকে তুলনামূলকভাবে নিরস মনে হয়। আসলে বায়ুমণ্ডলে অতিরিক্ত কণার কারণে রঙের বিশুদ্ধতা প্রভাবিত হয়।
বায়ুমন্ডলে যখন দূষণকারী কণা এবং অন্যান্য ধূলিকণা ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি আটকে থাকে তখন আকশে রঙের বৈচিত্র থাকে না। বৃহৎ ধূলিকণাসমূহ সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তের প্রাণবন্ত রঙ দেখার ক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করে। তাই, পরিষ্কার বাতাস সবচেয়ে সুন্দর সূর্যোদয় বা সূর্যাস্ত প্রত্যক্ষ করতে সহায়ক। ঠান্ডা, শুষ্ক এবং পরিষ্কার বাতাসে রঙের মাধূর্য ফুটে উঠে।
গ্রহ, উপগ্রহ আর মহাকাশ থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত কেমন দেখায় তা নিয়ে বর্তমান প্রবন্ধে আলোচনা করা হলো। আশা করি আপনাদের ভালো লাগবে। যদি ভালো লাগে তরে শেয়ার করার অনুরোধ করছি।
মহাকাশ থেকে সূর্যোদয়
পৃথিবীতে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের ছবি ভিন্ন রকমের হয়ে থাকে। উদাহরণস্বরূপ, আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের মহাকাশচারী ডন পেটিট সূর্যোদয়কে মহাজাগতিক রঙ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। কি সুন্দর মহাজাগতিক রং ছড়িয়েছে পৃথিীর দিগন্তে! এমন নতুন দিনের দেখা পেলে কেউ ক্লান্ত হয় না চিত্র নং- ১)।
দক্ষিণ চীন সাগরের উপরে পৃথিবীর দিগন্ত জুড়ে সূর্যের বিকিরণ দেখা যাচ্ছে দ্বিতীয় ছবিটিতে (চিত্র নং ১)। প্রতি ২৪ ঘন্টা অন্তর মহাকাশ স্টেশনটি পৃথিবীর কক্ষপথে ১৬ বার প্রদক্ষিণ করে। ফলে তারা ১৬টি সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তের দেখা পায়।
চিত্র নং- ১: সূর্যোদয়ে পৃথিবীর দিগন্তে মহাজাগতিক রঙ ও দিগন্ত জুড়ে আলোর খেলা
মহাকাশ থেকে সূর্যাস্ত
ভারত মহাসাগরে সূর্যাস্তের এই ছবিটি আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের নভোচারীরা তুলেছিলেন (তিত্র নং- ২)। পৃথিবীর বক্রতা দিগন্ত রেখা বা অঙ্গ বরাবর দৃশ্যমান। পৃথিবীর অন্ধকার পৃষ্ঠের উপরে রঙের একটি উজ্জ্বল ক্রম মোটামুটিভাবে বায়ুমণ্ডলের বেশ কয়েকটি স্তরকে নির্দেশ করে।
পৃথিবীর পৃষ্ঠ থেকে ৬-২০ কিমি উঁচু পর্যন্ত বিস্তৃত ট্রপোস্ফিয়ারে গাঢ় কমলা এবং হলুদ রঙ দেখা দেখা যাচ্ছে। এই স্তর বায়ুমণ্ডলের ভরের ৮০ শতাংশেরও বেশি এবং প্রায় জলীয় বাষ্প, মেঘ এবং বৃষ্টির পানি। এই স্তরের মধ্যে বেশ কয়েকটি কালো মেঘের স্তর দৃশ্যমান। রঙের তারতম্য মূলত মেঘ বা অ্যারোসলের ঘনত্বের তারতম্যের কারণে হয়ে থাকে।
মেঘের উপরে গোলাপী থেকে সাদা অংশটি নিম্ন স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার এবং এটি পৃথিবীর পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার উপরে বিস্তৃত। স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারের উপরে, নীল স্তরগুলি সম্ভবত মধ্যম এবং উপরের বায়ুমণ্ডলের মধ্যে রূপান্তরকে চিহ্নিত করে কারণ এটি ধীরে ধীরে বাইরের মহাকাশের কালো রঙে মিশে গেছে।
চিত্র নং- ২: মহাকাশ থেকে পৃথিবীর বুকে সূর্যাস্ত
মাটির বুকে দাঁড়িয়ে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখা
ভোরের আকাশে যখন দিনমনি দেখা দেয় তার সৌন্দর্য ভাষায় প্রকাশ কর সম্ভব নয়। ধীরে ধীরে রাঙিয়ে দেয় আকাশ, মেঘ আর পানি (চিত্র নং- ৩)। আবার দিন শেষে বিদায়ের প্রাক্কালে প্রায় একই রূপ। তবে তা ধীরে ধীরে রাতকে স্বাগত জানানোর জন্য, মানুষ, পশু-পাখীর বিশ্রামের জন্য।
চিত্র নং- ৩: পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখা
চাঁদ হতে সূর্যোদয় দেখা
চাঁদেতো আর সবাই যেতে পারে না। তাই অন্যের চোখে চাঁদে সূর্যোদয় দেখতে কেমন লাগে তা দেখানোর জন্য ফায়ারফ্লাই অ্যারোস্পেসের ব্লো ঘোস্ট ল্যান্ডার চাঁদে অবতরণের স্থান থেকে সূর্যোদয়ের একটি দৃশ্য ধারণ করেছে। ছবিতে পকমার্ক করা চাঁদের পৃষ্ঠ দেখা যাচ্ছে এবং দিগন্তে সূর্যের উজ্জ্বল আলো জ্বলছে (চিত্র নং ৪)।
চাঁদে সূর্যাস্তের সময় একটি উজ্জ্বল, অর্ধচন্দ্রাকার কুয়াশার মতো আলোর ছটা যা ক্ষুদ্র ভাসমান ধূলিকণা দ্বারা সূর্যের আলো ছড়িয়ে পড়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করা হয়।
চাঁদে সূর্যাস্ত
চাঁদ থেকে ক্ষণিকের সূর্যাস্ত দেখতে গেলে যা দেখা যায় তা হলো চন্দ্র দিগন্তের উপরে একটি উজ্জ্বল, অর্ধচন্দ্রাকার কুয়াশার মতো আলোকিত অংশ (চিত্র নং- ৪)। এটি সৃষ্টি হওয়ার মূল কারন হলো ক্ষুদ্র, ভাসমান ধূলিকণা দ্বারা সূর্যের আলো ছড়িয়ে পড়া।
চিত্র নং- ৪: চাঁদে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত
মঙ্গলে সূর্যোদয়
নাসার ভাইকিং ২ ল্যান্ডার ১৯৭৮ সালের ১৪ জুন মহাকাশযানের ইউটোপিয়া প্লানিটিয়া অবতরণ স্থানে মঙ্গলগ্রহের সূর্যোদয়ের এই দৃশ্য ধারণ করেছিল। ভোরের তোলা ছবিগুলি বেশ অন্ধকার। কেবল সূর্যের অবস্থানের উপরের আকাশ উজ্জ্বল (চিত্র নং- ৫)। আকাশে এই উজ্জ্বলতা দেখা দেয় কারণ সূর্যের আলো ছড়িয়ে পড়ে এবং বায়ুমণ্ডলের ধুলো এবং বরফের ক্ষুদ্র কণা দ্বারা বিশেষভাবে শোষিত হয়।
মঙ্গলে সূর্যাস্ত
নাসার মার্স এক্সপ্লোরেশন রোভার স্পিরিট ১৯শে মে, ২০০৫ তারিখে মঙ্গল গ্রহের গুসেভ গর্তের নীচে সূর্য ডুবে যাওয়ার সময় এই অত্যাশ্চর্য দৃশ্য ধারণ করে (চিত্র নং- ৫)। আমরা যদি সেখানে থাকতাম তাহলে সূর্যের উপরে আকাশের নীলাভ আভা আমাদের কাছে দৃশ্যমান হত। বাস্তবে প্যানক্যামের ইনফ্রারেড ইমেজিং ক্ষমতার বলে মঙ্গল গ্রহের আকাশ দিনের রঙের তুলনায় অতিরঞ্জিত।
চিত্র নং- ৫: মঙ্গল গ্রহে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত
প্রশ্নোত্তর
সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তে বর্ণিল রঙের ছটা কিসের কারণে তৈরি হয়?
আলো-বিহীন আকাশে সূর্যের আলো ধূলিকণার ওপর পড়ে বিচ্ছুড়িত হয়ে রঙের ছটা তৈরি হয়।
সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের রঙের ছটাগুলো সাধারণত কোন রঙের হয়?
লাল, কমলা, হলুদ, গোলাপি, ও বেগুনি রঙের ছটা দেখা যায়।
রঙের আলোর ছটা দেখার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময় কোনটি?
সূর্যোদয় বা সূর্যাস্তের সময়।
বর্ণিল রঙের ছটা দেখলে মানুষের মনে কেমন অনুভব জন্মে?
এটি দৃষ্টিনন্দন ও শান্তির অনুভূতি জাগায়, প্রকৃতির অপূর্ব সৌন্দর্য দেখায়।
রঙের ছটা কিভাবে আরও সুন্দর হয়ে ওঠে?
আকাশের পরিষ্কার ও অপূর্ব আবহাওয়া থাকলে রঙের ছটা আরো ঝকঝকে ও সুন্দর দেখায়
উপসংহার
গ্রহ উপগ্রহের সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময় আকাশে বর্ণিল রঙের ছটা দেখা দেয়। যখন সূর্য উদিত হয় তখন আকাশে লাল, কমলা, হলুদ ও গোলাপি রঙের মিশ্রণে উজ্জ্বল আলো ছড়ায়। সূর্যাস্তের সময় এই রঙের ছটা আরও সুন্দর ও মনোহর হয়ে উঠে। এই প্রাকৃতিক দৃশ্য দৃষ্টিনন্দন ও শান্তির অনুভূতি জাগায়। প্রতিটি দিন শেষ হওয়ার মুহূর্তে আকাশের এই রঙের ছটা আমাদের প্রকৃতির অপূর্ব সৌন্দর্য দেখায়।