দাঁতের গোপন জীবন চিত্র: শিশুকাল, যৌবন-প্রৌঢ়ে রুট ক্যানেল আর বৃদ্ধকালে দাঁতহীন

Category: Health & Wellness | Tags: No tags

Author: Jatish Chandra Biswas | Published on: October 17, 2025, 1:57 a.m.


চোখ বন্ধ করে দাঁত ছাড়া জীবন কল্পনা করুন: কামড়ানো নেই, সুন্দর হাসি নেই, ভেতরে কোনও অনুভূতিও নেই। আসলে প্রতিটি মানুষই দাঁত ছাড়াই জীবন শুরু করে। ধীরে ধীরে দুধ দাঁত বের হয়। তারপর দেখা মেলে স্থায়ী দাঁতের এবং অতপর ফোকলা দাঁতের হাসি! নানান কারনেই দাঁত হারাতে হয়।

জীবনের দীর্ঘ যাত্রা পথে আমাদের দাঁত ক্ষয়, সংক্রমণ এবং কাঠামোগত ক্ষতির ঝুঁকিতে থাকে। আমরা যত্নবান না হলে দাঁত হারাতে হয়; আর অমরা আফশোষ করি। তাইতো বলা হয় দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা বোঝা যায় না।

মুখ ও দাঁত পরিস্কার রাখলে অনেক সমস্যা থেকে মুক্তি মেলে। এর মধ্যে ডেন্টাল স্কেলিং হলো একটি অন্যতম পরিষ্কার পদ্ধতি যা দাঁত থেকে প্লাক এবং শক্ত হয়ে যাওয়া টার্টার অপসারণ করে। এটি নিয়মিত করলে মাড়ির রোগ থেকে রেহাই পাওয়া যেতে পারে।

আমরা অবশ্য অনেকেই শেষ ধাপে এসে দাঁতকে রক্ষা করতে সচেষ্ট হই। আবার কেউ কেউ দাঁত ফেলে দেয় আর্থিক অনটনে। তবে দাঁতকে বাাঁচানোর আধুনিক বিস্ময়গুলির মধ্যে একটি হলো এন্ডোডন্টিক চিকিৎসা, যা সাধারণত রুট ক্যানেল নামে পরিচিত। এর মাধ্যমে দাঁত তোলা ফেলা থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। 

যাই হোক। দাঁতের ভেতরে আসলে কী ঘটে? আর কখন আমাদের হস্তক্ষেপ করা উচিত? আমি আপনাকে দাঁতের জীবনের গল্প- দাঁতগুলি কীভাবে চ্যালেঞ্জগুলির মুখোমুখি হয় এবং এন্ডোডন্টিক্স কীভাবে এর উদ্ধারে ভূমিকা পালন করে তা নিয়ে আলোচনা করব।

দাঁতের যাত্রা: জন্ম, বৃদ্ধি, বার্ধক্য

গর্ভাবস্থার ৫ম বা ৬ষ্ঠ সপ্তাহে দাঁতের বিকাশ শুরু হয় (https://www.dentalhealth.ie/children-oral-health/infants/tooth-development1/), শিশুকালেই দাঁত দেখা দেয় এবং কৈশোরে স্থায়ী দাঁত দ্বারা দুধ দাঁত প্রতিস্থাপিত হয়। সময়ের পরিক্রমায় ক্ষয় হওয়া, ভেঙে যাওয়া এবং রোগের কারণে দাঁতের ক্ষতি হতে পারে বা দাঁত পড়ে যেতে পারে। নান্দনিকতা ধরে রাখতে এবং দাঁত হারাতে না চাইলে আজীবন যত্ন করতে হবে।

দাঁতহীন থেকে শুরু জীবন

শিশুদের জন্মের সময় দাঁত দেখা যায় না। অবশ্য ব্যতিক্রম থাকতে পারে। দাঁতের বিকাশ (ওডোন্টোজেনেসিস) শুরু জরায়ুতে, কিন্তু শিশুকালে লুকিয়ে থাকে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে,  গর্ভবতী মায়ের সুষম এবং পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ শিশুর দাঁতের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ৬-১২ মাসের মধ্যে দুধের দাঁত বের হতে শুরু করে এবং ৩৩ মাসের মধ্যে বেশিরভাগ শিশুর দাঁত বের হয় এবং প্রায় ৬ বছর বয়সে তা পড়তে শুরু করে।

স্থায়ী দাঁতের আগমন

প্রায় ৬ থেকে ৭ বছর বয়সে মাড়িতে প্রথম পেষণদন্ত দেখা দেয় এবং কর্তনদন্ত বের হয়। প্রায় ১৩ বছর বয়সে বেশিরভাগ কিশোর-কিশোরীর ২৮টি স্থায়ী দাঁত থাকবে। যাদের মধ্যে রয়েছে চারটি কেন্দ্রীয় কর্তনদন্ত, চারটি পার্শ্বীয় কর্তনদন্ত, আটটি প্রিমোলার, চারটি ছেদন দন্ত এবং আটটি পেষণদন্ত।

দাঁতের শেষের শুরু

বার্ধক্য, মাড়ির রোগ, ক্ষয় রোগ এবং অন্যান্য কারণে বৃদ্ধ বয়সে দাঁত ক্ষয় হতে পারে। তবে এটি ৩০ বছরের শেষের দিকে বা ৪০ বছরের প্রথম দিকেও শুরু হতে পারে। অনেক প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি দাঁতে গর্ত, পেরিওডন্টাল রোগ, মাড়ি সরে যাওয়া, আঘাত, এমনকি ধূমপানের কারণেও দাঁত হারাতে পারেন।

সারা জীবন ধরে দাঁতকে সহ্য করতে হয় চাপ, ব্যাকটেরিয়ার আক্রমন এবং আঘাত। কখনো কখনো শক্ত এনামেলের নীচে সমস্যা তৈরি হতে পারে আমাদের অগোচরেই। তাইতো দাঁতের ডাক্তারের কাছে প্রতি বছর যাওয়া উচিৎ। তবে খরচের ভয়ে আমরা অনেকেই যাই না।

কেন করবেন ডেন্টাল স্কেলিং? 

ডেন্টাল স্কেলিং হলো একটি পরিষ্কারের পদ্ধতি যা দাঁত থেকে প্লাক এবং শক্ত হয়ে যাওয়া টার্টার অপসারণ করে। এটি প্রায়শই মাড়ির রোগের চিকিৎসার জন্য সুপারিশ করা হয়। এতে মাড়ির রেখার উপরে এবং নীচে পরিষ্কার করার জন্য আল্ট্রাসাউন্ড বা ম্যানুয়াল যন্ত্র ব্যবহার করা হয়।

তারপরে দাঁতের পৃষ্ঠ মসৃণ করার জন্য পলিশিং করা হয়। এই পদ্ধতিটি "ডিপ ক্লিনিং" নামেও পরিচিত এবং অধিকতর গুরুতর ক্ষেত্রে রুট প্ল্যানিংয়ের সাথে একত্রে সুপারিশ করা হতে পারে।

যখন দাঁতের হৃদপিণ্ড (পাল্প) সমস্যাগ্রস্থ

স্নায়ু এবং রক্তনালীতে সমৃদ্ধ দাঁতের পাল্প (চিত্র নং- ১) ক্ষয়, ফাটল বা আঘাতের কারণে সংক্রামিত হতে পারে। যখন ব্যাকটেরিয়া আক্রমণ করে, তখন প্রদাহ এবং ব্যথা দেখা দেয়। ফলে দাঁতের জীবনীশক্তি হুমকির সম্মুখীন হয় এবং চিকিৎসা না করা হলে ফোড়া বা নেক্রোসিসের দেখা দেয়।

ডেন্টাল পাল্প কী?

প্রতিটি দাঁতের ভেতরে একটি সূক্ষ্ম প্রকোষ্ঠ আছে যার মধ্যে থাকে পাল্প। পাল্পের মধ্যে স্নায়ু, রক্তনালী, বিশেষায়িত কোষ এবং সংযোগকারী টিস্যু থাকে যা দাঁতের জন্য পুষ্টি সরবরাহ করে। সহজ ভাষায় বলতে গেলে- ডেন্টাল পাল্পই আপনার দাঁতকে জীবন্ত রাখে।

চিত্র নং- ১: দাঁতের বিভিন্ন অংশ 

পাল্প কীভাবে সংক্রামিত হয়?

গভীর ক্ষয়, ফাটল, আঘাত অথবা পুনরাবৃত্তিমূলক পুনরুদ্ধার এনামেল এবং ডেন্টিনকে ভেঙে ফেলতে পারে। ফলে ব্যাকটেরিয়া পাল্পকে আক্রমণ করতে পারে। এর ফলে প্রদাহ (পাল্পাইটিস), নেক্রোসিস (মৃত্যু) এবং সংক্রমণ হতে পারে।

দাঁতের সমস্যার লক্ষণ

আপনার মনে হতে পারে:

  • তীব্র সার্বক্ষণিক দাঁত ব্যথা
  • গরম বা ঠান্ডার প্রতি সংবেদনশীলতা
  • কামড় দিলে বা টোকা দিলে ব্যথা করে
  • ফুসকুড়ি বা সাইনাস ট্র্যাক্ট (মাড়ি "পিম্পল")

তবে কখনো কখনো কোন ব্যথা থাকে না, নীরব সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে।

নায়কের আবির্ভাব: এন্ডোডন্টিক চিকিৎসা

এন্ডোডন্টিক চিকিৎসা সংক্রামিত দাঁতের পাল্প অপসারণ করে। রুট ক্যানেল পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত করে এবং পুনরায় সংক্রমণ রোধ করার জন্য সেগুলিকে বন্ধ করে দেয়া হয়। এই পদ্ধতি ব্যথা উপশম করে, সংক্রমণ বন্ধ করে, দাঁত ফেলে দিতে হয় না, মুখের স্বাস্থ্য ঠিক রাখে এবং দাঁতের কার্যকারিতা পুনরুদ্ধার করে।

দাঁতের শিকড় উপড়ানোর ধাপ

প্রথমেই রোগ নির্ণয়ের জন্য দাঁতের ভিতরের অংশ দেখার জন্য বেদনাণাশক ইন্জেকশন দেওয়া হয়। অল্প কিছু সময় অপেক্ষার পর পাল্প চেম্বারে পৌঁছানোর জন্য ডাক্তার একটি গর্ত তৈরি করেন। তারপর সংক্রামিত পাল্প অপসারণ করেন (চিত্র নং- ২)। 

যদি দাঁতে মাড়িতে ফোড়া থাকে তবে তাও ফেলে দেন। দাঁতের ভেতরের অংশ পরিষ্কার করেন এবং ফিলিং করার জন্য কাঙ্খিত আকৃতি বানান। অতপর খালি জায়গা গুট্টা-পারচা (একটি রাবারি ফিলিং) এবং সিলার দ্বারা ফাঁকা স্থান ভরে দেন। ব্যাকটেরিয়া মেরে ফেলার জন্য একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ খেতে বলেন।

চিত্র নং- ২: রুট ক্যানেলের সময় সংক্রামিত পাল্প অপসারণ 

 

চিকিৎসার জন্য সাধারণত ২ বা তার বেশি অ্যাপয়েন্টমেন্ট লাগে। প্রতি অ্যাপয়েন্টমেন্ট ১ থেকে ২ ঘন্টা অথবা কখনো কখনো তারও বেশি সময় লাগতে পারে। সাময়িকভাবে ফিলিং করা হতে পারে। সব শেষে দাঁত পুনর্নির্মাণ করা হয় এবং প্রায়শই একটি মুকুট দিয়ে দাঁতের শক্তি ফিরিয়ে আনা হয়।

রুট ক্যানেলের খরচ

বাংলাদেশে একটি রুট ক্যানেলের খরচ সাধারণত ৫,০০০ থেকে ২০,০০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। অবশ্য দাঁতের অবস্থান এবং জটিলতার উপর নির্ভর করে খরচ বাড়বে না কমবে। একক-মূলযুক্ত সামনের একটি দাঁতের চিকিৎসায় প্রায় ৫,০০০-১০,০০০ টাকা; প্রিমোলার ৮,০০০-১৫,০০০ টাকা এবং মোলার (একাধিক মূল সহ) ১২,০০০-২০,০০০ টাকা লাগে। তবে ক্রাউন অন্তর্ভুক্ত করলে খরচ বেড়ে গিয়ে হতে পারে ১৫,০০০-৩০,০০০ টাকা পর্যন্ত।

কৃত্রিম ক্রাউনের ধরণ

বিভিন্ন ধরনের ক্রাউন পাওয়া যায়। আর্থিক সক্ষমতা এবং রুচিবোধের উপর নির্ভর করে কোন ধরনের ক্রাউন লাগানো হবে।

পোর্সেলিন ক্রাউন 

পোর্সেলিন ক্রাউন দেখতে স্বাভাবিক মনে হয় এবং সামনের দাঁতের জন্য উপযুক্ত। এগুলি আসল দাঁতের মতো দেখতে। ফলে চারপাশের দাঁতের সাথে সহজেই মিশে যায়।

সিরামিক ক্রাউন

সিরামিক ক্রাউনগুলি পোর্সেলিন ক্রাউনের মতোই নান্দনিক ও মনোরম। ধাতুর প্রতি অ্যালার্জিযুক্ত ব্যক্তিরা এটি ব্যবহার করতে পারেন।

মেটাল ক্রাউন

সোনা বা অন্যান্য ধাতু দিয়ে তৈরি ধাতব ক্রাউনগুলি পেষনদন্তের জন্য আদর্শ। কারণ এগুলি অত্যন্ত শক্তিশালী এবং ক্ষয় প্রতিরোধী।

পোর্সেলিন-ফিউজড-টু-মেটাল (PFM) ক্রাউন

এগুলি ধাতব শক্তির সাথে পোর্সেলিনের সমন্বর করে বানানো হয়। এতে সৌন্দর্য ঠিক থাকে। তদুপরি সামনের এবং মাড়ির পিছেনের দাঁতের জন্য যুৎসই।

জিরোকোনিয়া ক্রাউন

জিরকন তাদের স্থায়িত্ব এবং প্রাকৃতিক চেহারার জন্য সুপরিচিত। জিরকোনিয়া ক্রাউনগুলি অতিরিক্ত শক্তির প্রয়োজন হয় এমন মোলারের জন্য খুবই উপযোগী।

রুট ক্যানেল করতে গিয়ে কী ভুল হতে পারে?

হ্যাঁ, হতে পারে। আসলে রুট ক্যানেলের সাফল্য নির্ভর করে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরিষ্কার করা, ছিদ্র বন্ধ করা এবং সঠিকভাবে পুনরুদ্ধারের উপর। তবে সাফল্যের হার শতকরা ৮৫-৯০ ভাগ হতে পারে। 

কিন্তু পুনরায় সংক্রমণ, ক্যানেল বানাতে ভুল করা বা ফ্র্যাকচার ব্যর্থতার কারণ হতে পারে। সঠিক কৌশল এবং ফলোআপ চিকিৎসা করা দাঁতের দীর্ঘমেয়াদী সংরক্ষণ নিশ্চিত করে।

সাফল্যের পূর্বাভাস

সাফল্য নিম্নলিখিত বিষয়গুলির উপর নির্ভর করে:

সম্ভাব্য ব্যর্থতা এবং জটিলতা

  • নিম্নলিখিত কারণগুলো ব্যর্থতা বা জটিলতা ডেকে আনতে পারে:
  • ক্যাণেল বানানোতে ভুল হওয়া বা জটিল শারীরস্থান (anatomy),
  • ফুটো দাঁতের মাধ্যমে পুনরায় সংক্রমণ,
  • দাঁতের ভাঙন,
  • ফিনিক্স ফোড়া (দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতের পরে একটি প্রদাহ) তৈরি হওয়া, এবং
  • পুন:চিকিৎসা বা সার্জিক্যাল এপিকোএক্টমি (মূলের আগায় অস্ত্রোপচার) 

যখন একটি প্রচলিত রুট ক্যানেল ব্যর্থ হয়, তখন এপিকোএক্টমি সময় বাঁচাতে পারে। এটি হলো  দাঁতের শিকড়েড় ডগাটি অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সরিয়ে সিল করে দেয়া।

আধুনিক উদ্ভাবন এবং ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা

অণুবীক্ষণ যন্ত্র, থ্রিডি ইমেজিং, লেজার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অগ্রগতি রুট ক্যানেল থেরাপিতে ভুল কমাচ্ছে। ন্যানোম্যাটেরিয়াল এবং রিজেনারেটিভ এন্ডোডন্টিক্স সহ উদীয়মান প্রযুক্তিগুলি প্রাকৃতিকভাবে পাল্প টিস্যু নিরাময় করতে সাহায্য করছে। এগুলো ভবিষ্যতে দাঁতের যত্নের জন্য প্রতিশ্রুতিশীল এবং জৈবিকভাবে সমাধানের ক্ষেত্রকে এগিয়ে নিচ্ছে।

মাইক্রোস্কোপ, লেজার এবং রোবোটিক্স

জটিল ক্যানেলগুলি আরও ভালভাবে দেখতে এবং চিকিৎসা করার জন্য দন্তচিকিৎসকগন মাইক্রোস্কোপ এবং অতি সূক্ষ্ম যন্ত্র ব্যবহার করেন। রোবটগুলি এই ক্ষেত্রে এগিয়ে আসছে। যেমন- ডেন্টিবট এন্ডোডন্টিক্সের জন্য একটি রোবোটিক সিস্টেম যা প্রয়োজন অনুযায়ী কাজ করতে করতে পারে এবং ভুল কমাতে পারে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ইমেজিং

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI অ্যালগরিদমগুলি এক্স-রে এবং CBCT স্ক্যান বিশ্লেষণ করে দাঁতের শিকড়গুলিকে ভাগ করে সাফল্য মূল্যায়ন করতে সাহায্য করে। বিশেষজ্ঞগণ একমত পোষন করেন যে, এন্ডোডন্টিক যত্ন পরিকল্পনা করার সময় রোগীর সামগ্রিক স্বাস্থ্য বিবেচনা করতে হবে। এই বিশেষজ্ঞ ঐক্যমত্য দেশজুড়ে এন্ডোডন্টিক এবং ক্লিনিকাল চিকিৎসায় বিশেষজ্ঞদের একটি সমন্বিত প্রচেষ্টা হওয়া উচিৎ।

দৈনন্দিন যত্ন এবং প্রতিরোধ

নিয়মিত দাঁত ব্রাশ করা, ফ্লস করা উচিৎ। সুষম খাদ্য, ফ্লোরাইডযুক্ত টুথপেস্ট ব্যবহার এবং মুখ গহ্বরে আঘাতের দ্রুত চিকিৎসা করা দরকার। দাঁতের জটিল চিকিৎসা পদ্ধতি এড়াতে চাইলে প্রতিরোধমূলক যত্ন সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

দৈনন্দিন অভ্যাস

প্রতিদিন দুইবার দুই মিনিট ধরে ব্রাশ করুন, ফ্লস করুন, ফ্লোরাইডযুক্ত টুথপেস্ট ব্যবহার করুন, চিনিযুক্ত খাবার সীমিত করুন, ধূমপান বাদ দিন, সুষম খাবার খান, এবং ৩-৪ মাস পর পর ব্রাশ পাল্টান, ব্যথা বা বিবর্ণতা দেখা দিলে দাঁতের ডাক্তারের কাছে যেতে দেরি করবেন না

নিয়মিত পর্যবেক্ষন/পরীক্ষা

মাড়ির রোগের লক্ষণ (যেমন লাল, ফোলা বা রক্তপাত) বা মুখের ক্যান্সার (যেমন ঘা যা সহজে নিরাময় হচ্ছে না) এর দিকে মনোযোগ দিন। নির্দিষ্ট সময় পর পর এক্স-রে এবং দাঁতের পরীক্ষাগুলি পাল্পের ক্ষতি করার আগেই ক্ষয় সনাক্ত করতে সাহায্য করে।

গুজব এবং ভুল ধারণা 

গুজব খুব দ্রুত ছড়ায়। চিকিৎসার ক্ষেত্রেও তা বিরল নয়। যেমন- এন্ডোডন্টিক চিকিৎসা করালে ব্যথা, ক্যান্সার বা অন্যান্য রোগ হয়। তাই যেকোনো মূল্যে এ ধরনের চিকিৎসা ব্যবস্থা এড়িয়ে চলা উচিত বলে প্রচলিত ভুল ধারণা রয়েছে। 

তবে রুট ক্যানেল চিকিৎসা করালে ক্যান্সার হবে এমন কোনও বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ নেই। কাজেই গুজবে কান দিবেন না। বিজ্ঞান এগিয়ে যাচ্ছে- তার সুফল উপভোগ করা উচিৎ।

দাঁত তোলা সবসময় ভালো নাও হতে পারে। যেমন- স্নায়ুতে ব্যথা কয়েক মাস ধরে চলতে পারে। তাই যখন সম্ভব তখন প্রাকৃতিকভাবে দাঁত সংরক্ষণ করাই উত্তম। 

সাম্প্রতিক গবেষণায় দাঁতের স্বাস্থ্য এবং চোখের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র দেখানো হয়েছে। ব্যাকটেরিয়া এবং প্রদাহ শেষ পর্যন্ত সংক্রমণের কারণ হতে পারে যা কেবল দাঁতের অখণ্ডতাকেই নয় বরং আপনার দৃষ্টিশক্তিকেও প্রভাবিত করতে পারে।

প্রশ্নোত্তর

জন্মের সময় শিশুদের দাঁত থাকে না কেন?

কারণ তাদের দাঁত তখন চোয়ালের ভিতরে বিকশিত হয় এবং পরে বের হয়।

ব্যথা ছাড়াই কি দাঁতে সংক্রমণ হতে পারে?

হ্যাঁ—কখনো কখনো পাল্প নেক্রোসিস প্রাথমিকভাবে লক্ষণহীন থাকে এবং শুধুমাত্র এক্স-রে এর মাধ্যমে সনাক্ত করা যায়।

রুট ক্যানেল কি দাঁত তোলার চেয়ে বেশি ব্যথা করে?

আধুনিক অ্যানেস্থেসিয়া কৌশলগুলি অনেক ক্ষেত্রেই দাঁত তোলার চেয়ে রুট ক্যানেল চিকিৎসাকে কম বেদনাদায়ক করে তোলে।

রুট ক্যানেল কি দাঁতের শিকড় তোলার মতোই?

না, শিকড় থেকে যায়। শুধুমাত্র ভিতরের সংক্রামিত পাল্প অপসারণ করা হয়।

গুট্টা-পারচা কী?

এটি পরিষ্কারের পর ক্যানেল বন্ধ করার জন্য ব্যবহৃত স্ট্যান্ডার্ড ফিলিং উপাদান।

রুট ক্যানেল চিকিৎসা কতক্ষণ স্থায়ী হয়?

সাধারণত এক বা দুটি অ্যাপয়েন্টমেন্ট লাগে। তবে জটিল ক্ষেত্রে আরো সময় প্রয়োজন হতে পারে।

রুট-ক্যানেল চিকিৎসা করা দাঁত কি ভঙ্গুর হয়ে যায়?

হতে পারে; বিশেষ করে যদি অনেক কাঠামো অপসারণ করা হয়। তাই তাদের রক্ষা করার জন্য একটি মুকুট লাগানো হয়।

রুট ক্যানেল ব্যর্থ হলে কী হবে?

পুনঃচিকিৎসা বা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে এপিকোইক্টমির প্রয়োজন হতে পারে। অথবা কখনো কখনো সফল না হলে তা অপসারণ করা লাগতে পারে।

জটিল রোগ যেমন- ডায়াবেটিস কী রুট ক্যানেলের সাফল্যের উপর প্রভাব ফেলতে পারে?

হ্যাঁ, সাধারণ স্বাস্থ্যগত অবস্থা নিরাময় এবং পূর্বাভাসের উপর প্রভাব ফেলতে পারে।

রুট-ক্যানেল-চিকিৎসা করা দাঁত দিন টিকে থাকে?

সঠিকভাবে পুনরুদ্ধার এবং রক্ষণাবেক্ষণ করা হলে অনেক দাঁত সারাজীবন টিকে থাকে; সাফল্যের হার প্রায়শই শতকরা ৮৫-৯০ ভাগ।

উপসংহার

আমাদের দাঁত একটি নাটকীয় জীবনযাপন করে। যার শুরু হয় অদৃশ্যভাবে বৃদ্ধি পাওয়া দিয়ে। তারপর শিশুকালে দাঁত ওঠে, ক্রমে ক্ষয় হয় এবং পড়ে যায় কোন একদিন। কয়েক দশক ধরে নানা রকমের চাপ, ব্যাকটেরিয়ার আক্রমন আর বয়স্ক হওয়ার বিবর্ণতা তাকে সহ্য করতে হয়। 

মুখ ও দাঁতের স্বাস্থ্যের জন্য ডেন্টাল স্কেলিং করে প্লাক এবং শক্ত হয়ে যাওয়া টার্টার অপসারণ করাতে হবে। এটি মাড়ির রোগের চিকিৎসার জন্য একটি ভালো উপায়। নিয়মিত দাঁত ব্রাশ করতে হবে।

দাঁতের পাল্প সংক্রমিত হলে তা থেকে দাঁতকে বাঁচাতে হলে এন্ডোডন্টিক চিকিৎসা করাতে হবে। চিকিৎসায় জটিলতা এবং ব্যর্থতা দেখা দিতে পারে। তবে আধুনিক সরঞ্জাম, অণুবীক্ষণ যন্ত্র, রোবোটিক্স এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভুল কমাচ্ছে এবং সাফল্যের হার বৃদ্ধি করছে।